শনিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১২

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার ২০১২: জাদুকরী কোষ, কোষের জাদুকর

কীভাবে একটা গ্রাম বানাতে হয় জানেন?

একটি গ্রামে কী কী থাকে তা নিশ্চয়ই জানেন? এই লেখাটিতে আমরা একটি গ্রাম তৈরি করার কথা বলব। এই লেখাটিতে আমি একটি গড়পরতা গ্রামের কথা বলছি। কিন্তু চাইলে আপনি নিজের মত করেও এটাকে বদলে নিতে পারেন।

গ্রামের শুরুতেই প্রয়োজন একটি ভূখণ্ড। সেই ভূখণ্ডে পর্যাপ্ত মুক্ত বাতাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। গ্রামের মাঝ দিয়ে যেন বয়ে যায় স্রোতস্বীনি নদী। আড়মোড়া ভাঙা পাখির মত শাখা-প্রশাখা মেলে দিয়ে মেলে সেই নদী যেন গ্রামটাকে জড়িয়ে রাখে। একটা ভূখণ্ড হল। শাখামেলা নদীও হল। নাম দেয়া যাক। আমাদের এই গাঁয়ের নামটি খঞ্জনা। আমাদের এই নদীর নামটি অঞ্জনা।


গ্রামের যে নদী, সেই নদীই হচ্ছে গ্রামের রাস্তা। নদীতে শ্রমিকেরা চলাচল করবেন। যার বাড়িতে যা প্রয়োজন তা পৌঁছে যাবে নদীপথে। এই নদীতেই আবার টহল দিয়ে বেড়াবেন যোদ্ধারা। যোদ্ধারা সভ্য। তাঁরা এই গ্রামেরই কোন বাড়ির সন্তান। এই গ্রাম তাঁদের মায়ের মতই। তাঁরা শত্রুমিত্র চেনেন। তাঁদের হাতে কখনো গ্রামের সাধারন মানুষ কষ্ট পায়না। যোদ্ধারা যদি সাধারণের শত্রু হয়ে ওঠে তখন গ্রামটাই ধ্বংস হয়ে যায়।

গ্রামে কুমোরেরা থাকবেন, কামারেরা থাকবেন, কৃষকেরা থাকবেন, তাঁতীরা থাকবেন, শত্রুর সঙ্গে লড়বার জন্য যোদ্ধারা থাকবেন। গ্রামের কখন কী প্রয়োজন তা সকলেই জানতে পাবেন সংবাদ মাধ্যমে। ঝটপট গ্রামের প্রয়োজন মেটাবেন তাঁরা।

গ্রামে আর থাকবে শিশুরা। শিশুরা তাঁতী নয়, কুমোর নয়, কামার নয়, কৃষক নয়, যোদ্ধা নয়। শিশুরা গ্রামের ভবিষ্যত। এই শিশুরাই যখন বেড়ে ওঠে তখন তারা শ্রমিক হয়ে ওঠে। কামার কুমোর তাঁতী এমনকি আগামী দিনের যোদ্ধা হয়ে ওঠে তারাই।

আপনি যদি আপনার শরীরের কথা চিন্তা করেন, তাহলে সেটাকে এরকম একটি গ্রামের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন।

শরীরের একেক অংশে থাকে একেক রকমের কোষ। রক্তের কোষগুলো যেমন, লোহার ছোট ছোট টুকরো ধরে থাকায় যে কোষগুলোর রঙ হয়ে গেছে লাল, সেগুলোকে বলে রক্তের লোহিত কণিকা। লোহার টুকরোগুলো খুব দরকারী। কোষে কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে গেলে এসব কোষের লোহা লাগবেই। যে কোষগুলোর কোন রং নেই, আকারে বেশ বড়। এগুলোকে বলে শ্বেত কণিকা। এরা কিন্তু অনেক রকমের। কেউ কেউ আছে শরীরে জীবাণু ঢুকলে সেই জীবাণু ধরে ধরে খেয়ে ফেলে। তারপর আরো যারা রোগপ্রতিরোধী কোষ রয়েছে তাদের সংকেত দেয়। কেউ কেউ রয়েছে জীবাণুর গায়ে বিষ ছেড়ে দেয়।

রক্তের ভেতরে কয়েকটা জীবাণু ছেড়ে দিয়ে যদি মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেন তাহলে আপনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবেন। গিলেখাদক কোষেদের জীবাণু ধরে ধরে গিলে খেতে তো নিজের চোখেই দেখবেন। দেখবেন একটা বিশেষ কোষ আছে যারা খুব ছটফটে। জীবাণুর সংস্পর্শে এলেই থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে এরা দুম করে ফেটে মরে যাবে। ভাববেন না খুব বিপদ হলো। মরে যাবার জন্যেই এরা জীবাণুর কাছে যায়। এইসব কোষেরা মরে গেলে কোষের ভেতরে যে ডিএনএ'র সুতা থাকে সেসব বাইরে বেরিয়ে গিয়ে জালের মত জীবাণুকে আটকে ফেলে। এইসব জীবাণু তখন আর শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারেনা। অন্য জীবাণুরোধী কোষেরা এসে তখন তাদের মারে। জাল ফেলে জীবাণু ধরার এই বিষয়টি খুব বেশীদিন হয়নি আমরা জানি। এই বিষয়ে জানতে আমাদের এখনো অনেক বাকি।

জীবাণু আর রোগপ্রতিরোধী কোষ নিয়ে আমার বেশী নাড়াচাড়া বলে আমি এদের কথাই বললাম বেশি। একবার একটা কিছু বলতে থাকলে সেটা নিয়ে একগাদা কথা বলে ফেলার বদভ্যাসের জন্যেও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে আপনারা তো এমনিতেই জানেন শরীরে আছে কত কত রকমের আলাদা আলাদা কোষ। তাদের সবার কাজ আলাদা। সবার কাজ ভাগ করা। কখনো তারা একে অপরকে সাহায্য করে। একটা সুশৃংখল গ্রামের মত।

শরীরের এই যে এত এত কোষ এসব কোথা থেকে এসেছে জানেন? সব এসেছে একটিমাত্র কোষ থেকে। দারুণ না?

মানুষের শরীরের শুরু হয় মায়ের একটি ডিম্বাণু থেকে। ডিম্বাণু প্রাণের সুতিকাগার বটে কিন্তু কোষ হিসেবে অপরিপূর্ণ। একটি কোষে যতটা ক্রোমোজোম থাকা দরকার, ডিম্বাণুতে থাকে তার মোটে অর্ধেক। ডিম্বাণু থেকে প্রাণের শুরু করে দেয় শুক্রাণু। ডিম্বাণুতে যেমন কোষের প্রয়োজনীয় ক্রোমোজমের অর্ধেক থাকে, শুক্রাণুতেও তেমনি। একটি শুক্রাণু ডিম্বাণুতে প্রয়োজনীয় ক্রোমোজমের বয়ে নিয়ে আসে। ডিম্বাণু যখন শুক্রাণু থেকে প্রয়োজনীয় বাকি ক্রোমোজমগুলো পেয়ে যায় তখন একটি পূর্ণাঙ্গ কোষ হিসেবে সেটি খুব দ্রুত বিভাজিত হতে থাকে। সেই একটি কোষ থেকে শরীরের সব কোষ তৈরি হয়।

এইসব কোষ তৈরি হলেই সব শেষ নয়। এসব কোষেরা মরেও যায়। শরীরে কোষের মৃত্যু হয় আরেক চমকপ্রদ উপায়ে। স্বাভাবিকভাবে মৃত কোষ ফেটে যায় না ভেঙে যায় না। ছোট ছোট থলিতে পরিণত হয়। একটি বড় ময়দার বল ভেঙে অনেকগুলো ছোট ছোট ময়দার বল তৈরি করলে যেমন হয় সেরকম। ছোট ছোট থলির মত কোষের মৃত টুকরোগুলোকে রক্তের শ্বেত কণিকারা খেয়ে ফেলে। বর্জ্য নিষ্কাষণের মত। (ঠিক ধরেছেন। যেসব কোষেরা জীবাণু খেয়ে ফেলে, তারাই শরীরের মৃত কোষের টুকরো খায়।)

কোষেরা মরে গেলেই সব শেষ নয়। মৃত কোষের জায়গা দখল করে নতুন কোষ।

এইতো। যে কথাটি বলতে চেয়েছিলাম এইমাত্র তার ভূমিকা শেষ করা গেল।

আপনারা জানলেন, শরীরে দুটি খুব চমকপ্রদ ব্যপার ঘটে। প্রথমটি হচ্ছে, একটিমাত্র কোষ থেকে শরীরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তৈরি হয়। আরেকটি হচ্ছে, শরীরের অনেক কোষই একটা সময় পরে মরে যায়। তখন নতুন কোষ এসে তাদের জায়গা নেয়। নতুন সেই কোষেরা তো আকাশ থেকে পড়ে না। তাদের তৈরি হতে হয়।

এই যে কোষেরা শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর বিশেষায়িত কোষে (বিশেষায়িত কোষ মানে বিশেষ কোন কাজের জন্য তৈরি কোষ। রক্ত কোষ, পাকস্থলীর কোষ এসব।) পরিণত হতে পারে তাদের বলে স্টেম সেল। ২০১২'তে এসে স্টেম সেলের নাম না শুনে থাকার উপায় নেই। স্টেম সেল সব কোষের প্রাচীন অবস্থা। স্টেম সেলের দুটো প্রধান ভাগ। একটা হচ্ছে সোমাটিক স্টেম সেল। অনেকে এডাল্ট স্টেম সেলও বলেন। এরা নিজেরা বিভাজিত হয়ে নির্দিষ্ট কিছু কোষ বানাতে পারে। যেমন ধরেন যার কাজ পাকস্থলীর কোষ বানানো সে সেটাই কেবল বানায়। হেমাটোপোয়েটিক স্টেম সেল বলে একটা দল আছে তারা জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করবার জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষী কোষ বানায়। এডাল্ট স্টেম সেল অনেক কিছুই পারে, কিন্তু সব পারে না। সব পারে যারা তাদের বলে এমব্রায়োনিক স্টেম সেল। স্টেম সেলের দুটি মূল প্রকারের মধ্যে এটি একটি।

তারমানে শুরুতে বিশেষ যে এমব্রায়োনিক স্টেম সেল ছিল তারা তৈরি করল শরীরের সবকিছু। তাদেরকে বলা যাক শরীরের প্রাথমিক কোষ। অথবা শিশু কোষ।
প্রাথমিক কোষেরা যে কোষে রূপান্তরিত হয়ে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বানালো তারা হলো বুড়ো কোষ।
প্রাথমিক কোষেরা সোমাটিক স্টেম সেল নামের আরেক ধরনের আধবুড়ো কোষেও রূপান্তরিত হলো। কিন্তু এদের ক্ষমতা সীমিত। এই লেখায় এদের নিয়ে আলোচনা নেই।

এমব্রায়োনিক স্টেম সেল নিয়েই খানিক বকবক করব। এমব্রায়ো মানে জানেন তো? মায়ের পেটে একেবারে প্রথম কয়েকদিন আপনি গোটাকয়েক কোষের যে ছোট্ট একটা দলা হয়ে খাবি খাচ্ছিলেন সেটা হচ্ছে এমব্রায়ো। এমব্রায়োতে যে গোটাকয়েক কোষ ছিল সেগুলো থেকেই আপনার হাত পা নাক মুখ চোখ এবং ভুঁড়ি তৈরি। এমব্রায়োর যে কোষগুলো ভবিষ্যতে সবরকমের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইত্যাদি তৈরি করতে পারে এদেরকে এমব্রায়োনিক স্টেম সেল বলে। এরাই প্রাথমিক কোষ, যাদের কথা বললাম।

এমব্রায়োনিক স্টেম সেল এক জাদুর কোষ। এটাকে চাষ করা একটু শক্ত। কিন্তু ধরে বেঁধে চাষ করে ওদের ভাষায় যদি বলতে পারেন হৃদপিণ্ড হয়ে ওঠো তাহলে এরা সংখ্যায় বেড়ে গিয়ে একটা আস্ত হৃদপিণ্ড হয়ে উঠবে। যদি বলতে পারেন যকৃত হও, তাহলে এরা যকৃত হয়ে যাবে। এদের ভাষাটা একটু কঠিন। আমরা একটু একটু করে শিখছি। আর তাছাড়া এরা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেরকম পরিবেশ দেয়া একটু কঠিন। কিন্তু ভেবে দেখুন এমব্রায়োনিক স্টেম সেলের ক্ষমতা। ধরুন আপনি মূর্খের মত প্রেমে পড়ে প্রেমিকার হাতে হৃদয়ের দফারফা করিয়েছেন, অথবা কোন দূর্ঘটনায় আস্ত যকৃত ভর্তা করে ফেলেছেন, অথবা সংক্রামক রোগে স্নায়ুতন্ত্রের অর্ধেকটা ধ্বংস করে ফেলেছেন। এরকম দূঘর্টনায় এমনিতে আপনাকে খুঁজতে হবে আপনার সঙ্গে মেলে এরকম কারো অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা যায় কিনা। কিন্তু সেরকম কাউকে পাবেন কোথায়? কাউকে পেলেই তো আর হবে না। একশোভাগ একইরকম অংগ তো পাওয়া সম্ভব নয়। অন্য কারো অঙ্গ লাগালেই আপনার শরীরের রক্ষী কোষেরা বলবে এ অঙ্গ আমরা চিনিনা। এটা নিশ্চয়ই শত্রুর অংশ। মারো একে। এই অবস্থা থেকে বাঁচতে অষুধ দিয়ে আপনার শরীরের রক্ষী কোষেদের নির্জিব করিয়ে রাখতে হবে। সেইখানে আরো বড় বিপদ। আপনার শরীরের যতটা কোষ আছে তারচে দশগুণ আছে জীবাণু। শরীরের রক্ষীরা নির্জিব হয়ে পড়লে এইসব জীবাণু একেকটা আপনাকে একশোবার নরক দেখিয়ে আনবে। সবশেষেও সেই অঙ্গ কাজ করবে কীনা কে জানে! ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অসংখ্যা জটিলতার কথা তো আমি নিজেও জানিনা! শুধু জানি এ এক দারুণ কঠিন ব্যপার।

অন্যদিকে একটি এমব্রায়োনিক স্টেম সেলকে যদি বলা যায়, যাও বাবা, ওমুকের হৃদপিণ্ড ছাতু হয়ে গেছে, তোমরা আরেক কপি বানাও জলদি। আর তারাও যদি আপনার কথা শুনে আরেক কপি আপনারই হৃদপিণ্ড বানিয়ে দেয়? অথবা যকৃত, অথবা আর যেটা প্রয়োজন। তাহলে নিজেরই হৃদপিণ্ড নিজে লাগিয়ে নিলেন। হৃদয়ের অনেক কপি করে অনেককে হৃদয় দিতে পারলেন। (আমি কয়েকজনকে চিনি যাঁরা হৃদয় দেয়ার বিষয়ে খুব উদার। উন্মুক্তভাবে তাঁরা হৃদয় বিলান। আমার ধারনা তাঁরা প্রাথমিক কোষ গবেষণার ওস্তাদ লোক। নিজেদের রান্নাঘরে তারা গোপনে অতিরিক্ত হৃদপিণ্ড তৈরি করেন।)

মূল কথায় ফিরে আসি। এমব্রায়োনিক স্টেম সেল এক অমিত সম্ভাবণা। এদেরকে বলে প্লুরিপটেন্ট সেল। আমার ভুল না হয়ে থাকলে, Plural এবং Potential শব্দদ্বয় থেকে এসেছে Pluripotent। মানে যাদের রয়েছে অনেক সম্ভাবণা।

এতক্ষণে কী বলেছি আরেকবার মনে করিয়ে দেই। জীবণের প্রথম পর্যায়ে "এমব্রায়োনিক স্টেম সেল" অথবা প্রাথমিক কোষ থেকে সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি হয়। এই কোষগুলোর রয়েছে অমিত সম্ভাবণা। এদেরকে যদি ঠিকঠিক পরিবেশে ঠিক ঠিক ভাবে সংকেত দেয়া যায়, (মানে এদের ভাষায় এদেরকে আদেশ দেয়া যায়) তাহলে এরা যেকোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি করতে পারে। এরা এমনকি একটা আস্ত মানুষও তৈরি করে ফেলতে পারে।
Untitled drawing (1)

চিকিৎসা বিজ্ঞানে সেইজন্য স্টেম সেল, বিশেষত প্লুরিপটেন্ট কোষ এক হিরের খনি। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচে সেক্সি বিষয়গুলোর মধ্যে এটি একটি। প্লুরিপটেন্ট কোষ যাকে বলে জীব বিজ্ঞানের অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, নাটালি পোটর্ম্যান, কেইরা নাইটলি, আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট কখ, লুই পাস্তুর। যোগ্যতার হিসেবে এরা একেকটা নিকোলা টেসলা, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি!

এবার যে চিকিৎসায় নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে। তা দেয়া হয়েছে শরীরের এই প্রাথমিক কোষ নিয়ে গবেষণার জন্য। স্যার জন বি. গর্ডন এবং শিনয়া ইয়ামানাকা পেয়েছেন এই পুরষ্কার। কী করেছেন তাঁরা?

সহজে বলার চেষ্টা করি।

শরীরের প্রাথমিক কোষকে দিয়ে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করানো যায়। সে তো জানলেন। কিন্তু সেই কোষ পাবেন কোথায়? আপনার শরীরে স্টেম সেল আছে বটে কিন্তু সেসব তো সোমাটিক বা অ্যাডাল্ট। তাদের ক্ষমতা রয়েছে বটে কিন্তু তা সীমাবদ্ধ! (এসব কোষ নিয়েও কিন্তু দারুণ সম্ভাবণাময় গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য প্রাথমিক কোষ পাওয়া)।

আগে বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল কোষের বৃদ্ধি একমুখী। কোষ একবার বিশেষায়িত হয়ে গেলে সেই কোষকে আর প্রাথমিক কোষে রুপান্তরিত করা যায় না। মানে যে কোষ চাষবাসে লেগেছে তাকে দিয়ে আর তবলা বাজানো যাবে না। যে তবলা বাজাতে শুরু করেছে সে কার কখনো গান গাইবে না।

১৯৫২ সালে রবার্ট ব্রিগস আর থমাস কিং নামের দুজন বিজ্ঞানী একটি কোষের নিউক্লিয়াস (মানে কোষের নিয়ন্ত্রণের সব উপাদানের থলি) একটি ডিম্বাণুতে ঢুকিয়ে দিয়ে দিতে সফল হন। (নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপনের এই ধারনাটি অবশ্য প্রথম দেন নোবেল বিজয়ী জার্মান বিজ্ঞানী হান্স স্পেমান)। ডিম্বাণুর সাধারণ গুণাবলী তো আপনারা জানেনই। এটি উপযুক্ত সংখ্যাক ক্রোমোজম এবং উপযুক্ত সংকেত পেলে বিভাজিত হয় একটি নতুন প্রাণ তেরি করে। সাধারণভাবে একটি ডিম্বাণুতে যথেষ্ঠ ক্রোমোজম পৌঁছে দিয়ে সেই সংকেতটি দেয় একটি শুক্রাণু। কিন্তু পরীক্ষাগারে ব্রিগস এবং কিং ডিম্বানুতে আগে থেকেই যে ক্রোমোজম ছিল সেগুলো আল্ট্রোভায়োলেট রশ্মি দিয়ে নষ্ট করে দিলেন (আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ডিএনএ'র স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে দিতে পারে)। তারপর সেই ক্রোমোজমহীন ডিম্বানুতে অন্য কোষ থেকে আস্ত নিউক্লিয়াস এনে ঢুকিয়ে দিলেন। উদাহরণ দেই, ডিম্বানু হচ্ছে একটা এক চাকা ওয়ালা সাইকেলের মত। শুক্রাণু ওই সাইকেলের অন্য চাকাটির যোগান দেয় আর সাথে চলতে শুরু করার জন্য একটা ধাক্কাও দিয়ে দেয়। ব্রিগস আর কিং এক চাকাওয়ালা সাইকেল থেকে চাকাটা খুলে নিয়ে সেটাকে একেবারে মুড়ো করে দিলেন। তারপর দুটো নতুন চাকা এনে জুড়ে দিলেন। তারপর তাতে দিলেন ঠেলা।

ক্লোন করা ভেড়া ডলির কথা মনে আছে আপনাদের? ডলির ক্লোন করা হয়েছিল এভাবে। একটি ডিম্বানুতে তার একটি কোষের নিউক্লিয়াস ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৈরি করা হয়। আপনার কোষের একটি নিউক্লিয়াস নিয়ে যদি সেটি একটি ডিম্বানুর মাঝে ঢুকিয়ে দিয়ে বড় করা যায় তাহলে আরেকটি আপনি তৈরি হবেন। সেটাকে আপনার ক্লোন বলবে (কখনো কখনো সামান্য ব্যতিক্রম হতে পারে তবে সেই আলোচনায় আজকে যাবো না)।

রবার্ট ব্রিগস আর থমাস কিং একটি কোষের নিউক্লিয়াস নিয়ে ডিম্বাণুতে ঢুকিয়ে সেই একই কোষ তৈরি করতে গিয়ে ব্যর্থ হন (এই কথাটি খুব মোটাদাগে বলছি এজন্য যে পুরো বিষয়টা ব্যাখ্যা করা এই লেখায় সম্ভব নয়)। তখন কোষের একমূখী নীতি আরো শক্ত হয়। মানুষ জেনে যায় হাতির মাথা কেটে ঘোড়ার মাথা বসিয়ে দিলেই সেটা ঘোড়ার মত ভাবতে শেখে না। ফাঁকা ডিম্বাণুতে একটা কোষের নিউক্লিয়াস ঢুকিয়ে দিলেই সেটা ওই কোষ হিসেবে বেড়ে ওঠে না।

আমাদের বিজ্ঞানী গর্ডন সেই 'হয় না, হবে না' মেনে নিলেন না। তিনি আবারো চেষ্টা করলেন। ব্যাঙাচির একটি কোষের নিউক্লিয়াস নিয়ে তিনি ব্যাঙের ফাঁকা ডিম্বানুতে ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর সব ফেলে ব্রিটেন থেকে আমেরিকা গেলেন একেবারে অন্য বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে। চারবছর পরে তিনি যখন ফিরে এসেছেন ততদিনে তাঁর সেই তৈরি করা কোষ থেকে ব্যাঙাচি হয়ে ব্যাঙগুলো পুর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি সাধারণ পূর্ণাঙ্গ কোষকে একটি প্রাথমিক কোষে রূপান্তরিত করার চেষ্টা তাঁর সফল হয়েছে। কিন্তু কেউ তাঁর কথা পাত্তাই দিল না। সেই গবেষণা গ্রহন করতে পৃথিবীর আরো প্রায় ১০ বছর লাগলো। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কতখানি সে বুঝতে লাগলো ৫০ বছর। তিনি নোবেল প্রাইজ পেলেন আবিষ্কারের ৫০ বছর পর। শিনয়া ইয়ামানাকা'র সঙ্গে যৌথভাবে।
প্রফেসর জন বি. গর্ডন (ছবি: নোবেলপ্রাইজ.অর্গ)
শিনয়া ইয়ামানাকা কী করেছেন বলি।

গর্ডনের বিষয়টাতো জানলেনই। একটা সাধারণ বুড়ো কোষ থেকে তিনি ব্যাঙ বানিয়ে দেখালেন যে বুড়ো কোষও প্রাথমিক শিশু কোষে পরিণত করা যেতে পারে। যে শিশু কোষ আস্ত প্রাণি তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু তার জন্য বুড়ো কোষের নিউক্লিয়াস নিয়ে ডিম্বাণুতে বসিয়ে দিতে হবে। এটা যুগান্তকারী আবিষ্কার। কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষেরা ভাবতে লাগলেন, কাটাকাটি না করে একটা বুড়োকোষকে আস্ত রেখেই তাকে একটি শিশু কোষে পরিণত করা যায় কিনা। প্রাথমিককভাবে বৈজ্ঞানিকরা ভাবলেন, সেটি সম্ভব নয়।

প্রতিভাবানরাই বৃত্তের বাইরে ভাবতে পারেন। 'হয়না হবেনা' ইয়ামানাকাও মেনে নিলেন না। একটি বুড়ো কোষের নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন ছাড়াই তিনি সেটাকে শিশু কোষে পরিণত করতে চাইলেন। খানিকটা বৈজ্ঞানিক বিস্তারিতসহ পুরো বিষয়টি জানতে নোবেল প্রাইজ ওয়েব সাইটের এই ডকুমেন্টটি পড়ে নেয়া ভালো। ইয়ামানাকা'র গবেষণা প্রবন্ধ পড়ে ফেলা সবচে ভালো। আমি নিজে জটিল বিজ্ঞান লিখতে পারি না। আমার জানাশোনাও খুব কম। তাই জটিলতায় না গিয়ে সহজে বলছি।

আপনারা নিশ্চয়ই এতদিনে জেনে গেছেন যে, কোষের ভেতরে ডিএনএ নামের এক ধরনের সুতো থাকে। সেই সুতোতে জীবনের সব হিসেব-নিয়ম-কানুন লেখা। ডিএনএ-তে যা লেখা থাকে কোষ সেটা মেনে চলতে বাধ্য। কিন্তু আবার, ডিএনএ-তে জীবনের সকল পর্যায়ের সকল নিয়ম কানুন লেখা থাকে। সেখানে যেমন লেখা থাকে আস্তে হাঁটো। তেমনি লেখা থাকে ঝেেড় দৌড় দাও। একটি কোষ কোন সময়ে কী করবে?

খুব গোঁজামিল দিয়ে বললে, ডিএনএ-র একটি অংশ যেটি বিশেষ কোন কাজের জন্য নির্দিষ্ট সেটাকে একটি জিন বলে। একটা রান্নার বইয়ের কথা ভাবুন। বইটা একটা ডিএনএ। নির্দিষ্ট খাবার রান্নার উপর একটি অধ্যায় হচ্ছে একেকটি জিন। ডিএনএ-তে ঝেড়ে দৌড় দাও লেখা অংশ একটি জিন। লাফাতে থাকো অংশটা আরেকটি জিন। গান গাও অংশটা একটি জিন। কোন জিনটি কখন প্রকাশিত হবে (অথবা কাজ করতে শুরু করবে। expression এর বাংলা করার চেষ্টা করেছি।) সেটা নির্ভর করে অনেক বিষয়ের উপর। সেখানে যেমন পরিবেশের প্রভাব থাকতে পারে তেমনি অন্য জিন, কোষের পরিবেশ, কোষের কোন উপাদান ইত্যাদিরও প্রভাব থাকতে পারে।

ইয়ামানাকা দেখলেন, কোষগুলো যখন শিশু থাকে তখন তাদের ভেতরে "বিশেষ" অনেকগুলো জিন কাজ করে। এরকম ২৪টি জিনকে তিনি আলাদা করলেন যেগুলোকে তাঁর মনে হল যে কোষকে শিশু রাখার জন্য দায়ী। এরপর তিনি একটা বুড়ো কোষকে নিয়ে তার ভেতরে ওই ২৪টি জিন প্রকাশিত হবার ব্যবস্থা করলেন। সেই হলো শুরু। ২৪টি জিনকে প্রকাশিত করার ব্যবস্থা করে একটি বুড়ো কোষকেও প্রাথমিক কোষ বানিয়ে ফেললেন তিনি। প্রাথমিক অবস্থায় ইয়ামানাকার নির্দিষ্ট করা ২৪টি জিন ছিল একটা খসড়া হিসাব। তিনি নিশ্চিত ছিলেন না পুরো ২৪টি জিনই কোষকে শিশু রাখার জন্য জরুরি কিনা। একটি একটি করে তিনি ওই ২৪টি জিনের ভেতর থেকে সত্যি সত্যি যে জিনগুলি কোষকে শিশু বানাতে পারে সেই ৪টি জিন নির্দিষ্ট করেন। নাম মুখস্ত রাখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটি অভাবনীয় তথ্য হিসেবে জেনে রাখতে পারেন। Oct3/4, Sox2, Klf4, এবং c-Myc ফ্যাক্টরগুলো (অথবা দায়ী জিনগুলো) আপনার একটি সাধারণ কোষকে একটি এমব্রায়োনিক স্টেম সেল অথবা প্লুরিপটেন্ট কোষে পরিণত করতে পারে। যাকে আমরা বলেছি শরীরের প্রাথমিক কোষ। সেই প্রাথমিক কোষটি থেকে ল্যাবরেটরিতে আপনার একটি আস্ত স্নায়ুতন্ত্র অথবা হৃদপিণ্ড বানানো যাবে। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? আমি শুনেছি মানুষ চাঁদে গিয়েছে তা অনেকেই বিশ্বাস করে না। আমি জানি অনেকেই বিবর্তন মানে না। মানুষের প্রতিভার যেমন সীমা নেই তেমনি মানুষের গোঁড়ামি আর নির্বুদ্ধিতারও কোন সীমা নেই।
শিনয়া ইয়ামানাকা (ছবি: নোবেলপ্রাইজ.অর্গ)

আর কী বলব?
প্রফেসর গর্ডন অথবা ইয়ামানাকার জীবন বৃত্তান্ত ইত্যাদি নিশ্চয়ই আপনারা জেনে গিয়েছেন। নেটে অসংখ্য লেখা দেখেছি। গর্ডন কীভাবে সায়েন্সে পড়ার আবেদন করার মত শিক্ষার্থীও ছিলেন না, কীভাবে তাঁর শিক্ষকেরা তাঁকে একেবারে বাজে জঘণ্য শিক্ষার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল সেও নিশ্চয়ই আপনাদের অজানা নয়। একটা আবিষ্কারের ৬ বছরের ভেতরেই নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার জন্য ইয়ামানাকার আবিষ্কারকে কত গুরুত্বপূর্ণ হতে হয়েছে তাও আপনাদের অবোধ্য নয়। (একটি ছোট্ট তথ্য দেই, ইয়ামানাকা'র সেই গবেষণাপত্রটি ৫ বছরে উদ্ধৃত হয়েছে প্রায় ৫ হাজার বার। জীববিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থীর জন্য আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ পেয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাও এরচে বাস্তব)।

(একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন। গর্ডন এবং ইয়ামানাকার কাজ একই ধারার। তাঁদের কাজের উদ্দেশ্যও একই। কিন্তু তাঁদের গবেষণার ধরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইয়ামানাকা যদিও বলেন, তাঁর কাজ নির্ভর করে আছে গর্ডনের কাজের উপর কিন্তু বাস্তবে ইয়ামানাকা কাজ করেছেন একেবারেই ভিন্নভাবে। গর্ডন যে সময়ে তাঁর আবিষ্কার করেছেন তখনকার বিজ্ঞানের ক্ষমতা আজকের বিজ্ঞানের মত ছিলনা। বিজ্ঞান তখনো আলাদা করে জিন নিয়ে কাজ করবার মত উন্নত হয়ে ওঠেনি। আর তাছাড়া, গর্ডন নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন করেছেন। মস্তিস্ক বদলে দেয়ার মত। ইয়ামানাকা কেবল জিনের প্রকাশ নিয়ে কাজ করেছেন। কোষের নিউক্লিয়াস আলাদা করে ফেলেন নি।)

একটি গ্রাম তৈরির করছিলাম আমরা মনে আছে? আমরা জানতাম কৃষক শ্রমিক মজুরের ভেতরে শিশুর মনটুকু রয়েই যায়। কিন্তু সেই মনটাকে জাগিয়ে দিয়ে কৃষককেও শিশু করে ফেলা যায় তা আমাদের জানা ছিল না। গর্ডন আর ইয়ামানাকা আবিষ্কার করেছেন কীভাবে কৃষকের ভেতরে শিশুর মনটাকে জাগিয়ে তোলা যায়। কীভাবে কৃষক একটি শিশুতে বদলে যেতে পারেন। একটি খুব স্থায়ী আর সম্ভাবণাময় গ্রামের জন্য এটি কত দারুণ ব্যপার তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: