বুধবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১২

চলমান কুরুক্ষেত্র এবং নিরস্ত্র দাঁত

মানুষ অথবা অন্য কোন প্রাণি মরে গেলেই পচে যায় সে নিশ্চয়ই জানেন। আপনি কি জানেন, এখনই কেউ মরে গেলে কখন তার শরীর পচে যেতে শুরু করবে? মৃত্যুর কতক্ষণ পর থেকে পচন শুরু হয়?

জবাব হচ্ছে, পচে যাওয়ার জন্য মরে যাওয়া কোন প্রয়োজন নেই। পচে যাওয়ার জন্য কেবল জন্মানো প্রয়োজন। জন্মের পর থেকেই আপনি প্রতি মুহূর্তে পচে যাচ্ছেন। কীভাবে পচে যাচ্ছেন সেটি বোঝার আগে কীভাবে বেঁচে আছেন সেটি মোটাদাগে বুঝে নেয়া যেতে পারে। একটি কোষের বেঁচে থাকার বর্ণনা দিলেই একটি প্রাণির বেঁচে থাকার নিয়ম বুঝতে পারা যায়।

কোষ একটা আপাত স্বয়ংসম্পূর্ণ জৈবিক সত্ত্বা। অনেকগুলো প্রোিটন মিলে খানিকটা তেল জাতিয় পদার্থ আর শর্করার সঙ্গে একটা থলি বানিয়েছে। সেই থলির ভেতরে বেশিরভাগটাই পানির মধ্যে ডুবে আছে আরো এটাসেটা প্রোটিন, শর্করা, চর্বি, ছোট ছোট যৌগ এসব। আর আছে নানারকমের জটিল কলকব্জা। কলকব্জা তৈরি হয়েছে ওই প্রোটিন-চর্বি-শর্করা মিলিয়েই। এইসব কলকব্জা প্রতিমুহূর্তে ঘটঘট করে কাজ করছে। বেঁচে থাকতে তাদের বিরতি নেই, কেবল খাটনি আর খাটনি। তেল মশলায় চুবানো কলকব্জা ভর্তি প্রোটিন-শর্করার এই থলি হচ্ছে একটা কোষ। 

আপনার শরীরের নানারকম কোষেরা নানারকম জটিল কাজ করে প্রাণের শৃংখল টিকিয়ে রাখছে বলেই আপনি বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকতে হলে কোষেদের সর্বক্ষণ কাজ করতে হয়। কিন্তু কাজ করতে গেলে শক্তি চাই। শক্তি বানাতে খাদ্য চাই। পেটে জোর না থাকলে হাতুড়ি চলে না!

কোষেরা খাদ্য থেকে রাসায়নিক উপায়ে শক্তি তৈরি করে। কোষেদের খাদ্য কিন্তু গোস্ত ঠাসা রুটির টুকরো নয়। কোষেরা ওই টুকরো থেকে দু-চারকণা শর্করা অথবা চর্বি অথবা খুব বিপদে পড়লে প্রোটিন নিয়ে শক্তি তৈরির মেশিনে চালান করে দেয়। কোষেদের আরো নানা কাজে খাদ্য লাগে। কোথাও একটু কেটে ছিঁড়ে গেলে সারাই করতে খানিকটা প্রোটিন, চর্বি অথবা শর্করা দরকার হতে পারে। কোষেরা নানা যন্ত্রপাতিতে যে জটিল কাণ্ড চলছে সেসবের মশলাও আসে খাদ্য থেকে। দেহের নানা কাজের সমন্বয় রাখতে শক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার দরকার। যোগাযোগের জন্য প্রোটিনের টুকরোর চিঠি চালাচালি হয় সারা দেহে। স্নায়ুতে স্নায়ুতে ছুটে চলে যে বিদ্যুতের সংকেত তার যোগানও আসে ওই খাদ্য থেকেই। এ এক মহাযজ্ঞ!

প্রাণের মহাযজ্ঞ চালিয়ে যেতে কোষেদের খাবার দরকার। কিন্তু ওই যে বললাম, কোষেরা আস্ত গরুর টুকরো ব্যবহার করতে পারেনা। কোষেদের চাই গরুর কোষে যে প্রোটিন-চর্বি-শর্করা রয়েছে সেসবের ছোট ছোট টুকরো। একটা আস্ত গাছ যেমন চুলায় জ্বালিয়ে রান্না হয়না। ডাল ছেঁটে, কেটে ছোট ছোট টুকরো করে তারপর সে চুলায় জ্বালানো যায়, সেরকম।

গরুর গোস্ত থেকে কোষে প্রোটিন-চর্বির টুকরো পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটা খুব সংক্ষেপে বলি। আস্ত গরু কেটে সেটাকে যখন সেদ্ধ করা হয় তখনই তার কোষের-প্রোটিনের যে শক্ত বাঁধন সে হালকা হয়ে যায়! কোষের-প্রোটিনের শক্ত বাঁধন নষ্ট হয়ে যায় বলেই সেদ্ধ মাংস নরম হয়ে যায়! রান্নার আগে কাঁচা মাংস ছিঁড়তে চেষ্টা করলে বুঝতে পারবেন কোষের-প্রোটিনের বাঁধন কত শক্ত! সেদ্ধ মাংস আপনি দাঁতে পিষে ভালোরকম মিহি টুকরো করে যখন পাকস্থলীতে পাঠিয়ে দেন তখন সেখানে এনজাইমের দল সেই আলগা হয়ে যাওয়া মিহিটুকরো মাংসকে আরো ছোটছোট টুকরো করে ফেলে। সেইসব ক্ষুদ্রটুকরো প্রোটিন-চর্বি-শর্করা তখন শরীরের কোষে কোষে পৌঁছতে পারে। কোষেরা সেসব তাদের প্রয়োজন মত কাজে লাগায়।

সব মিলিয়ে যা বললাম সে হলো, বেঁচে থাকতে হলে চাই খাদ্য। এবং মানুষেরা গরু-ভেড়া-ধান-গম-আলু যা পায় সবই কেটেকুটে খেয়ে বাঁচে। এইসব ধান-গম-গরু সবই পেটের ভেতরে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে কোষে পৌঁছে।

পচন বিষয়ে বলতে শুরু করে এতটা লিখতে হল। খাবার ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়ার যে প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিলাম এটাকে পচন বলতে পারেন। আমরা অবশ্য তা বলি না। মানুষের পেটে খাবার টুকরো হলে সেটাকে আমরা বলি হজম হওয়া। জীবাণুরা যখন খাদ্য টুকরো করে তখন সেটাকে আমরা পচন বলি।

সাধারণভাবে যা-ই পচুক, সে জীবাণুর জন্য পচে। জীবাণুদের আলাদা করে পাকস্থলী নেই বলে তারা খাবার কেটে রান্না করে পেটে পুরে হজম করতে পারেনা। তারা খাবারের কাছে গিয়ে খাবার টুকরো করার এনজাইম ছেড়ে দেয়। এনজাইমের ক্রিয়ায় খাবার যেখানে ছিল সেখানেই অতিক্ষুদ্র টুকরো হয়ে যায় (পচে যাওয়া জিনিস মাত্রই সেজন্য নরম হয়ে যায়)। খাবার ভেঙে গেলে, প্রোটিন-চর্বি-শর্করার এসব টুকরো তখন জীবাণু তার কোষের ভেতরে নিয়ে নানান কাজে লাগাতে পারে। জীবাণুরা এই প্রক্রিয়ার সময় অতিরিক্ত নানারকমের এটাসেটা পদার্থও বানায়। এসবের ভেতর অনেক আছে যা জীবাণুর খাদ্যউপাদান ব্যবহার করার পর তৈরি বর্জ্য। অনেক আছে যা খাদ্য ভেঙে ফেলার সময়ে তৈরি বর্জ্য অথবা রাসায়নিক। জীবাণুর তৈরি এসব রাসায়নিক যদি দূর্গন্ধযুক্ত হয় তখন পঁচে যাওয়া জিনিস থেকে গন্ধ বেরোয়! তবে কোনকিছু পচে গেলেই তা দূর্গন্ধযুক্ত হবে এমন কোন কথা নেই। দই কিন্তু বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে পচে যাওয়া দুধ! 

যে কথা বলে শুরু করেছিলাম, আপনি প্রতি মুহূর্তে পচে যাচ্ছেন। একটি তথ্য দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। আপনার শরীরে আপনার একটি কোষের বিপরীতে অন্তত ১০টি জীবাণু বাস করে। এদের খাদ্যের জোগান দিতে আপনাকে খানিকটা পচে যেতেই হয় প্রতিমুহূর্তে। জীবাণুদের বড় অংশ থাকে আপনার পাকস্থলীতে। এরা আপনার শরীরে বাস করে, আপনার খাবার খায়, আপনার কোষ খায়। আপনার ত্বকে জীবাণুর চাদর বিছানো। এরা আপনার মৃত-অর্ধমৃত কোষ খায়, ত্বক থেকে নির্গত বিভিন্ন রাসায়নিক খায়।

সাবানে ডুব দিয়ে গোসল করার পরে শরীরে ঘামের গন্ধ তৈরি হতে কতক্ষণ লাগে হিসেব করে দেখেছেন? শরীরের ঘামে থাকা নানা উপাদান ত্বকের জীবাণুরা খেয়ে পচিয়ে ফেললেই ঘামের গন্ধ তৈরি হয়। মানুষ মরে গেলেও সেরকম পচন শুরু হতে সময় লাগে না। পচন আগে থেকেই হয়। মরে গেলে কেবল পচনের বিপরীতে আর নতুন কোষ তৈরি হয়না, জীবাণুর বিরুদ্ধে কোষের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। দেহের সব কোষ তখন জীবাণুরা খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে।

জীবিত অবস্থাতেও শরীরের বেশিরভাগ স্থানে প্রতিমুহূর্তে কোষেরা মরে যেতে থাকে। জীবাণুর আক্রমণে যেমন, তেমনি স্বাভাবিকভাবেও দেহের কোষ মরে যায়। পুরনো কোষের জায়গা দখল করে এসে নতুন তাজা কোষ। নির্দিষ্ট সময় পরে তারও মৃত্যু হয়। আবার জীবাণুর আক্রমণে যেসব কোষ মরে যায় নতুন কোষ এসে সেসবের অভাব পূরণ করে। সবমিলিয়ে আপনি একটি চলন্ত কুরুক্ষেত্র। আপনার শরীরে প্রতিসেকেণ্ডে লক্ষ মৃত্যু হচ্ছে, লক্ষ জন্ম হচ্ছে। বাঁচা-মরার লড়াই হচ্ছে প্রতিমুহূর্তে।

দুঃখজনকভাবে, শরীরের কোথাও কোথাও লড়াইয়ের হিসাবটা একতরফা। বিশেষত দাঁতে। দাঁত একটুখানি ক্ষয়ে গেলে আর নতুন করে তৈরি হয়না। মৃত্যুর পরে যেমন, তেমনি জীবিত অবস্থাতেও দাঁতের উপরিভাগ জীবাণুদের থেকে অনেকটা সুরক্ষাহীন। এমনিতে জীবাণুরা হাতিঘোড়া গ্যাস-রাসায়নিক সব খেয়ে হজম করে ফেলে। কিন্তু মুখে সাধারণত যেসব জীবাণু থাকে তারা সরাসরি দাঁতের উপাদানের উপর নির্ভর করে বাঁচে না। তারমানে দাঁত সরাসরি মুখের জীবাণুদের খাবার নয়।

কিন্তু দাঁত সারাক্ষণ ভিজে থাকে মুখের লালায়। লালায় খুব দারুণ জীবাণুরোধী উপাদান রয়েছে। লালায় থাকে এন্টিবডি। থাকে লাইসোজাইম নামের একটা এনজাইম যেটার কাজ হচ্ছে ব্যাকটেরিয়ার শরীরে ফুটো করে দেয়া। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ারাও নানা কৌশলে বাঁচতে জানে। ব্যাকটেরিয়ারা দল বেঁধে থাকে। তারা কৃত্রিম চামড়ার মত পাতলা পর্দা তৈরি করে নিজেদের জ্ঞাতিগোষ্টীসহ আস্ত গ্রাম ঢেকে রাখতে পারে। একে বলে বায়োফিল্ম। বায়োফিল্ম ভেদ করে এমনকি এন্টিবায়োটিকও জীবাণু মেরে সুবিধা করতে পারেনা।

এমনিতে দাঁত খুব শক্ত আর ব্যাকটেরিয়ারা তা খেয়েও ফেলে না। আর তাছাড়া পরিষ্কার দাঁতে ব্যাকটেরিয়ারা সহজে দাঁড়াতে বসতে পারেনা। কিন্তু দাঁত পরিষ্কার করার পরেই লালার আবরণে তা আবার ঢেকে যায়। লালায় জীবাণুরোধী উপাদান থাকলেও প্রোটিন, শর্করার মত উপাদানও থাকে যা ব্যাকটেরিয়ার লোভনীয় খাবার। এসবের সঙ্গে দাঁতে থাকে খাবারের টুকরো। আপনি খালি চোখে দেখে অথবা খুব স্পর্শকাতর জিহ্বা দিয়েও সে খাবারের অস্তিত্ব টের পাবেন না। কিন্তু খাবারের টুকরো সারা মুখেই থাকে। বিশেষত থাকে দাঁতের কোণায়, ফাঁকে, দাঁত আর মাড়ির যে সংযোগস্থল সেখানে আর দুই দাঁতের মাঝখানে। আপনার জন্য এসব জায়গা হিসাবে নেয়ার মত বড় না হলেও ব্যাকটেরিয়ার জন্য ওসব জায়গা গঞ্জ-বন্দর বসিয়ে দেয়ার মত বিস্তীর্ণ।

মুখে থাকা খাবারের টুকরো আর লালার বিভিন্ন উপাদান ব্যাকটেরিয়ারা ফেলে ছড়িযে খায়। আর দাঁতের কোণে ব্যায়োফিল্মের চাদর মুড়ে বসে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার তৈরি যেসব এটাসেটা বর্জ্য আর রাসায়নিকের কথা বললাম সেসবের মধ্যে থাকে অম্ল বা এসিড। সাধারণত এসব দূর্বল এসিড। কিন্তু সেটাই দাঁতের ক্ষয় করার জন্য যথেষ্ট। দাঁতের উপর ব্যাকটেরিয়া ঘরসংসার শুরু করলে সেজন্য দাঁতের ক্ষয় হয়। মসৃণ দাঁতে প্রথম যখন একটুখানি ক্ষয় হয় তখন ব্যাকটেরিয়ারা সেখানে ভালোমত জাঁকিয়ে বসতে পারে, সেখানে খাবারের টুকরোও সহজে জমা হয় আর সে জায়গা পরিষ্কার করাও মুস্কিল হয়ে যায়। একবার যেখানে ক্ষত তৈরি হয়েছে সেখানে ক্ষতের মাত্রা তাই উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। অনেকটা অবৈজ্ঞানিক শোনাবে, কিন্তু আমি বলতে পারি, আপনারা যাঁরা এই লেখাটি পড়ছেন তাঁদের প্রায় সবারই দাঁতে ক্ষত রয়েছে। হয়ত আপনি জানেন না, কিন্তু রয়েছে। যদি না থাকে তাহলে আপনি খুবই পরিচ্ছন্ন থাকেন, দাঁত সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারনা রাখেন এবং আপনি অলস নন। 

যা বলছিলাম, কেবল ব্যাকটেরিয়ার তৈরি এসিড নয়, এদের তৈরি কিছু এনজাইমও দাঁতের ক্ষতি করতে পারে। এইসব ব্যাকটেরিয়া থেকে একশোভাগ মুক্ত থাকার কোন উপায় নেই। আর মুখে লালা খুব জরুরি জিনিস। আপনি লালা-চায়ের ভক্ত না হতে পারেন কিন্তু লালার ভক্ত আপনাকে হতেই হবে। লালা না থাকলে আপনার দাঁত খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে। লালা থাকলেও যে এই প্রক্রিয়া থেমে থাকবে তা নয়, কিন্তু সেক্ষেত্রে ক্ষয় হবে ধীরে।

পচনের এই প্রক্রিয়া প্রতিমুহূর্তে চলমান। এই প্রক্রিয়া বন্ধ করার অথবা এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। শরীরের অন্যান্য অংশের ক্ষেত্রে আপনাকে সচেতনভাবে প্রতিমুহূর্তে ঢাল তলোয়ার নিয়ে লম্ফঝম্ফ না করলেও চলে। কিন্তু দাঁতের ক্ষেত্রে আপনাকে প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকতেই হবে। খুবই যন্ত্রণাদায়ক আর অসম্ভব মনে হচ্ছে হয়তো, কিন্তু জীবনের নিয়মই হচ্ছে এই। জেনে হোক অথবা না জেনে, প্রতিমুহূর্তে আপনাকে লড়তে হবে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আপনার শরীরের জীবাণুরা কখনো বিশ্রাম নেয় না!

দাঁতের ক্ষয় শুরু হলে যদি সৌভাগ্যবশত চোখে না পড়ে তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে বুঝতে পারা যায় না। কারণ হচ্ছে দাঁতের উপরিভাগ, যেটাকে এনামেল বলে, সেখানে কোন স্নায়ু নেই। তাই ক্ষত অথবা সংক্রমণের অনুভূতি হয়না। ব্যাথা লাগে না। দাঁতের ব্যাথা তৈরি হয় ক্ষত যখন দাঁতের এনামেল পেরিয়ে দাঁতের ভেতরের অংশ 'পাল্প'-এ পৌঁছে। মাড়ির কাছাকাছি অংশে অথবা মাড়ির নিচের অংশে দাঁতে ক্ষত তৈরি হলে কখনো কখনো মাড়িতেও সংক্রমণ হতে পারে। তখনো ব্যাথা হতে পারে, রক্ত পড়তে পারে। কিন্তু এছাড়া আপনি দাঁতের প্রাথমিক ক্ষত সম্পর্কে জানতে পারবেন না। অথচ একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় দাঁতের ক্ষত সারিয়ে তোলা যায়। শরীরের অন্যান্য অংশের মত শরীর নিজে থেকে দাঁতের ক্ষত সারিয়ে তুলবে না। দাঁতের ক্ষত সারিয়ে তুলতে হবে আপনাকেই। সেই সঙ্গে নতুন করে যাতে ক্ষত তৈরি না হয় সেটাও দেখতে হবে আপনাকে। 

আপনার টুথপেস্টে যদি ফ্লুরাইড, ক্যালসিয়াম আর ফসফেট থাকে তাহলে সেটি দাঁতের প্রাথমিক ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারে। মজার ব্যপার হচ্ছে দাঁতের প্রাকৃতিক এনামেলের চাইতে পরবর্তীতে তৈরি হওয়া এনামেল বেশি স্থায়ী আর জীবাণুরোধী। নতুন করে এনামেল তৈরির জন্য আপনাকে উপযুক্ত টুথপেস্ট আর ব্রাশ দিয়ে নিয়ম মেনে ব্রাশ করতে হবে। কোনরকম সোজাসুজি ঘষা দিয়ে পরক্ষণেই দুটো চকলেট খেয়ে ফেললে হবে না। দেখতে হবে দাঁতের সব অংশ ঠিকঠিক পরিষ্কার হয়েছে কিনা। ব্রাশের সঙ্গে দাঁতের ফ্লসিং খুব ভালো একটা অভ্যাস। দাঁতের লুকানো অংশ পরিষ্কার করার জন্য আদর্শ। এসবের সঙ্গে খাবারের বিষয়েও আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনি যখনই কিছু খান, সেই খাবার কিন্তু দাঁতের ব্যাকটেরিয়ারাও ভাগে পায়।

দাঁত রক্ষার এই যন্ত্রণা কিন্তু প্রতিদিনের। যেটুকু সময় আপনি থেমে থাকবেন, সেটুকু সময় ব্যাকটেরিয়ারা কাজ করবে। আপনার ৭০ বছরের জীবনের জন্য আপনার কতটুকু দাঁত আছে হিসেব করে দেখুন। কতটুকু অবহেলা করা উচিত হবে সেই হিসেবও নিশ্চয়ই আপনি করে ফেলতে পারবেন। দাঁতের যত্ন নেয়া সহজ কোন পদ্ধতি নয় (আর এটা ব্যয়সাপেক্ষও)। কিন্তু দাঁত আপনার শরীরের অংশ। দাঁতের যত্ন কীভাবে নিতে হয়, কতদিন পরপর ডাক্তার দেখাবেন, দাঁতের সমস্যা না থাকলেও কেন ডাক্তার দেখাবেন, কীভাবে ব্রাশ করতে হয়, কোন ধরনের টুখপেস্ট ভালো, কীভাবে ফ্লসিং করতে হয় সেসব নিশ্চয়ই আপনি জানেন। না জানলেও জানানোর মত অসংখ্য বিশ্বস্থ সাইট পাবেন একটু খুঁজলেই। আমি কেবল প্রতিমুহূর্তে আপনি কীভাবে পচে যাচ্ছেন সেটা আপনাকে জানালাম। আপনার শরীরের কোথাও কোথাও এই পচন শরীর তার নিজের নিয়মে সামলাচ্ছে। কোথাও কোথাও শরীর সেটা পারছে না। দাঁত যেমন। আপনি আপনার দাঁত পচে যেতে দেবেন কীনা সেটা আপনার সিদ্ধান্ত।

পুনশ্চ: আমি আমার জীবনে অসাধারণ সব মানুষের সংস্পর্শে এসে ধন্য হয়েছি। শান্তনু বণিক তাঁদের একজন। স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়েই তা নির্ণয়ের দ্রুত আর কার্যকর নতুন পদ্ধতির আবিষ্কারক। এই লেখাটি শান্তনু'দার জন্য। দাঁতের ডাক্তারের উপরে তিনি ক্ষেপে গেছেন দেখলাম ক'দিন আগে। তাকে মনে করিয়ে দেয়া দরকার, এখন খানিকটা কষ্ট হলেও সহ্য করতে হবে। আমাদের স্বস্তির বিয়েতে নকল দাঁত নিয়ে গেলে চলবে না। আমাদের রাজকন্যার আশেপাশে নকল জিনিস নিষিদ্ধ! 

সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: