রবিবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১২

আইসিএসএফ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ঘিরে আপনার কৌতুহলের জবাব

আইসিএসএফ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে অপপ্রচারের মাত্রা এই সময়ে অনেক বেশি বেড়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার বিরোধীরা মরিয়া হয়ে ন্যায়-অন্যায় সকল পথে বিচার বানচালের জন্য চেষ্টা করছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের অপপ্রচারে ভুলে অনেক সাধারণ মানুষও বিভ্রান্ত হচ্ছেন। অনেকের মাঝেই নতুন করে অনেক প্রশ্ন-কৌতুহল তৈরি হচ্ছে। আইসিএসএফ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ঘিরে সাম্প্রতিক তৈরি হওয়া এমন সব প্রশ্নের জবাব দেয়া হচ্ছে এই ব্লগে। এখানে আপনার কৌতুহলের জবাব না থাকলে মন্তব্য অংশে তা জানাতে পারেন। মন্তব্যে পাঠকের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব মূল লেখায় যুক্ত করে দেয়া হবে।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

আইসিএসএফ কী? কারা এর সদস্য?

আইসিএসএফ হচ্ছে 'ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্রাটেজি ফোরাম'।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পর্যবেক্ষণ, গবেষণা, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ, দেশীয়-আন্তর্জাতিক সকল প্রচার মাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা, দেশীয়-আন্তর্জাতিক অপপ্রচারের জবাব দেয়া, জনমত তৈরি, প্রশ্ন-কৌতুহলের জবাব দেয়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান স্পষ্ট করা ইত্যাদি অনেকগুলো প্রয়োজনের তাগিদে সারা বিশ্বের তিন ডজনেরও বেশি দেশে ছড়িয়ে থাকা ছাত্র, শিক্ষক, চাকুরিজীবি, আইনজীবি, গবেষক, বিশেষজ্ঞরা মিলে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্রাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ) নামের সংগঠনটি তৈরি করেন।

আইসিএসএফ এর মালিক বা হর্তাকর্তা কারা?

আইসিএসএফ স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠন। সদস্যরাই এই সংগঠনটির কার্যক্রম চালিয়ে নেন। আলাদা করে সভাপতি, প্রেসিডেন্ট অথবা ওরকম কোন পদ এই সংগঠনে নেই।

বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করার এরা কে?

আইসিএসএফ বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করে না। কোনভাবেই আইন ভঙ্গ না হয় তা নিশ্চিত করে আইসিএসএফ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়াকে সব রকমের সহযোগিতা করে। আইন ভঙ্গ না করে অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেয়া এবং সহযোগিতা করা বাংলাদেশের সকল নাগরিকের দ্বায়িত্ব। আইসিএসএফ সদস্যরা স্বদেশের সেই দায়ই পূরণ করার চেষ্টা করেন।

আইসিএসএফ না থাকলে কী হত?

বাংলাদেশের কলঙ্ক মুছে ফেলতে সচেষ্ট নাগরিকেরা না থাকলে যা হত, তাই। বাংলাদেশের স্বজনহারা মানুষ এবং আইসিএসএফ আলাদা কিছু নয়। বাংলাদেশের মানুষেরা যাঁরা নানাভাবে নানা পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে কাজ করছেন তাঁদের একাংশের সাংগঠনিক রূপই হচ্ছে আইসিএসএফ। যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষের মানুষ বাংলাদেশের সবাই। আইসিএসএফ না থাকলে কেবল এইসব মানুষদের একাংশের একটি সাংগঠনিক সমন্বয় থাকতো না।

আইসিএসএফ তৈরির প্রয়োজন হল কেন?

এই প্রশ্নটির জবাব অনেক বিস্তারিত। সংক্ষেপে দেয়া চেষ্টা করা যেতে পারে।

প্রথমত, স্বজন হত্যার বিচারের পর্যবেক্ষণ করা এবং সেই বিচারে সহযোগিতা করা বাংলাদেশের সকল মানুষের দায়। আইসিএসএফ সেই দায় পূরণ করতে চেষ্টা করে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের স্বদেশ দরিদ্র। সেই সঙ্গে স্বদেশের সামনে রয়েছে নানান রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। এসব এড়িয়ে গিয়েও, যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল (আইসিটি) যুদ্ধাপরাধের বিচার করছে সেই ট্রাইবুনালের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইসিটি'র সীমাবদ্ধতার এই তালিকা দীর্ঘ, সংক্ষেপে একটুখানি বলা যেতে পারে। আইসিটি'র নিজস্ব কোন ওয়েবসাইট নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একজন সাধারণ মানুষ উইকিপেডিয়ার যে নিবন্ধ থেকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাটি পেতে পারতেন সেই তথ্যকে বিতর্কিত করতে দিনরাত কাজ করে যুদ্ধাপরাধীদের ভাড়াটে টেকি গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী ২৪ ঘন্টা নিবেদিত এবং সক্রিয় (এরা কেবল আইসিটি নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল নিবন্ধ ভুল আর মিথ্য তথ্যে ভরিয়ে রাখতে দিনরাত কাজ করে)! উইকিপেডিয়ায় সেইসব নিবন্ধ দিনরাত তথ্য আর তথ্যসূত্র যোগান দিয়ে ঠিক রাখার কেউ নেই! আইসিটি'র নেই কোন 'মিডিয়া সেল'। বিচারে আগ্রহী মানুষের হাজারো প্রশ্নের জবাব দেয়ার কেউ নেই! যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীর ছড়ানো হাজারো বিভ্রান্তির জবাব দেয়ার কেউ নেই! বিচারক-আইনজীবি-সমন্বয়ক-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যোগাযোগের গ্রহনযোগ্য এবং নিরাপদ মাধ্যম নেই! যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার উপর সরকারের মনিটরিং দূর্বল! এরকম স্পর্শকাতর একটি বিচার, যেটির বিরুদ্ধে হাজারো মিথ্যে প্রচারণা, যেই বিচার হচ্ছে একটি নতুন আইনে, সেই বিচারের বিচারকদের সহায়তার জন্য কোন গবেষক নেই! বিচার প্রক্রিয়ার তথ্য-ইতিহাস সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেই!

আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে যে শক্ত লোকবল এবং অর্থ সংস্থানের প্রয়োজন হয় তা আইসিটি'র নেই। অন্যান্য আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের সঙ্গে তুলনা করলে এই বিষয়টি খানিকটা বোঝা যাবে। সিয়েরা লিওনের আন্তর্জাতিক অপরাধের ট্রায়ালে খরচ হয়েছে এখন পর্যন্ত ১৪৯ মিলিয়ন ডলার, কম্বোডিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধের ট্রায়ালে এই পর্যন্ত লেগেছে ১৭০ মিলিয়ন ডলার, ইয়োগোস্লাভিয়া ট্রায়ালে খরচ হয়েছে ৩০৬ মিলিয়ন ডলার আর রুয়ান্ডা ট্রায়ালে লেগেছে অন্তত ৬১৫ মিলিয়ন ডলার। এইসব দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীরা সংগঠিত, রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং অভূতপূর্ব লোকবল আর অর্থসম্পদের মালিক। অথচ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বাৎসরিক বাজেট ১.৫ মিলিয়ন ডলারেরও কম!

এই শেষ নয়!

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ৪০ বছরে নানাভাবে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনিতেই নষ্ট হয়েছে কত প্রমাণ, কমে গেছে প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা। যুদ্ধাপরাধীর বিচার ঠেকাতে জামায়াত দেশে বিদেশে নিয়ত সহস্র কোটি টাকা খরচ করছে। তাদের রয়েছে ভাড়া করা একাধিক আন্তর্জাতিক আইনী সহায়তাকারী সংস্থা যারা যুদ্ধাপরাধীদের আইনি সহায়তা দেয়, আন্তর্জাতিক মহলে মিথ্যে প্রচারণা চালায়, আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে, আন্তর্জাতিক মহলের সামনে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করে। এদের রয়েছে কোটি টাকার আমেরিকান লবিং ফার্ম যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে কাজ করে। এদের রয়েছে আন্তর্জাতিক পাবলিক রিলেশন সংস্থা সারা বিশ্বে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে প্রচারণা চালায়। (যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশ কোন মহাদেশে তা বলতে পারবে না, এই মাটির ৩০ লক্ষ সন্তানের লাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে তাদের আচমকা মানব-দরদী হয়ে জামায়াতের পক্ষে বক্তব্য দেয়ার কারণ আসলে মানব প্রেম নয়। এসব জামায়াতের ভাড়া করা আন্তর্জাতিক প্রচারণা ফার্মের অ্যাক্টিভিটি)। জামায়াতের পোষা ব্লগার, সাংবাদিক, কলামিস্ট আর বুদ্ধিজীবি দেশের ভেতরে-বাইরে প্রচারণা চালায় প্রতিনিয়ত। জামায়াত-শিবিরের সহস্র ভাড়াটে কর্মী অনলাইনে-অফলাইনে প্রতিটি মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে কাজ করে! আপনি চোখ মেললেই আশেপাশে এইসব তেলাপোকাদের দেখবেন!

যুদ্ধাপরাধের বিচারের এই উদ্যোগের সামনে এত এত প্রতিবন্ধকতা জেনেই আইসিএসএফ তৈরি হয়। আইসিএসএফ যুদ্ধাপরাধের বিচারে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণার কাজ করে, যুদ্ধাপরাধের বিচারে সবরকমের আইনি সহায়তা করে, এ সম্পর্কিত তথ্য-ইতিহাস রক্ষা করে, জাতীয়-আন্তর্জাতিক মহলে সকল মাধ্যমে অপপ্রচারের জবাব দেয়, ইতিবাচক প্রচারণা চালায়, বিচারের পক্ষে জাতীয়-আন্তর্জাতিক সকল অঙ্গনে জনমত তৈরি করে, সাধারণের প্রশ্নের জবাব দেয়, আইনের/বিচারের জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে, সমমনাদের একাত্ন করে, যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করার অথবা পিছিয়ে দেয়ার জন্য সকল স্ট্রাটেজির মোকাবেলা করে। আইসিএএসএফ যুদ্ধাপরাধের বিচার এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রে সক্রিয়।

ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন বিচারকের সঙ্গে কথা বলেছেন কেন?

মাননীয় বিচারপতি নিজামুল হক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের কথোপকথনের দুটি ক্ষেত্র রয়েছে। একটি একেবারেই ব্যক্তিগত আলাপন। অন্যটিও তাঁদের ব্যক্তিগত কথোপকথন হলেও সেই কথোপকথনের বিষয় আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার। ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল কে সহায়তা করেন। ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন একা নন, আইসিএসএফ এর সকল সদস্য নানাভাবে তাঁদের গবেষণা দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে সহায়তা করেন। এই সাহায্য কোন ব্যক্তিকে সহায়তা নয়। এটি একটি প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা, বিচারের পুরো প্রক্রিয়াকে সহায়তা।

এটা তো অন্যায়! বিচারক কেন তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন?

এটা একেবারেই অন্যায় কিছু নয়। মাননীয় বিচারপতি এবং ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন কেউই আইন ভঙ্গ করেন নি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের আইনটি একটি নতুন আইন। এই বিচারটিও স্পর্শকাতর, বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। বিচার কার্যে এই দেশের সকল মানুষের সহায়তা সেইজন্যেই প্রয়োজন। যে যেভাবে পারেন, যাঁর যেভাবে সক্ষমতা রয়েছে সেভাবেই তিনি এই বিচারকে সহায়তা করবেন। বিচারের পাশে থাকবেন। তবে অবশ্যই কোন আইন না ভেঙে। আর তাছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মাননীয় বিচারপতির পরামর্শ নেয়ার বিষয়টি কোন লুকোনো বিষয় নয়। এটি সবার জানা একটি বিষয়।

এতগুলো ইমেইল! এত লম্বা স্কাইপ কথোপকথন! কী সর্বনাশ!

সর্বনাশের কিছু নেই। অনেক ইমেইল এবং লম্বা কথোপকথন বিষয়টিকে আলাদা করে বাড়িয়ে বলাটা আসলে প্রচারণারই একটি উপায়।

উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলি। যদি কেউ তারামন বিবি'র একশো চিঠি চুরি করে আর সেই চিঠিগুলো ব্যবহার করে অপপ্রচার করতে চায় তাহলে সে কী বলবে? সে সবার আগে বলবে, "আরে তারামন বিবির তো একশো চিঠি রয়েছে আমার কাছে! একগাদা পৃষ্ঠা একেকটা চিঠিতে!"  চোরের ভাবখানা এমন যেন, তারামন বিবি তাঁর একশো চিঠিতে কারো নামে কুৎসা লিখে বেড়িয়েছেন। অথচ হয়তো তিনি তাঁর কোন আপনজনকে বাংলাদেশের কথা লিখে, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা লিখে ওই চিঠিগুলো পাঠিয়েছেন।

যে চুরি করেছে এবং যে অপপ্রচার করতে চায় সে হয়তো সমস্ত চিঠি থেকে একটি লাইন বের করবে এমন, "তারপর আমি স্থির চোখে বন্দুকের ট্রিগার চেপে ধরি..."। বাস্তবে হয়তো এই লাইনটি যুদ্ধের সময়ের। মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবি'র সাহসিকতার বর্ণনা। কিন্তু আলাদা করে শুনলে মনে হতে পারে তারামন বিবি হয়তো কাউকে গুলি করে খুন করেছিলেন আর সেসময় তাঁর চোখ একটুও কাঁপেনি! চোর ঠিক এই বিভ্রান্তি তৈরি করতেই আলাদা করে এই লাইনটি উল্লেখ করবে।

অনেকগুলো চিঠির কারণে সাধারণের কেউই ওই সবগুলো চিঠি পড়ে দেখবেন না। তাঁরা চিঠির কোন অংশটি সত্য আর কোন অংশটি বদলে ফেলা হয়েছে তা খুঁজে দেখবেন না। মাননীয় বিচারপতি এবং ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের কথোপকথনের বিষয়টিও এখানে তেমনভাবে প্রচার করা হয়েছে। আসলে তাঁদের কথোপকথনে তাঁরা কোনভাবেই আইন ভঙ্গ করেন নি। বরং তাঁদের কথায় প্রমাণ হয়েছে যে সকল চাপ উপেক্ষা করে তাঁরা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য একটি পূর্ণাঙ্গ এবং ছিদ্রহীন বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

বিচারের রায় নাকি লিখে দিয়েছেন ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন?

মজার বিষয় হচ্ছে বিচারের রায় লিখে দেয়ার এই প্রচারণার পরেও তথ্য যারা চুরি করেছে তারা সেই রায়ের কপিটি প্রকাশ করেনি। না করার কারণ হচ্ছে এরকম কোন রায় লেখা হয়নি। ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন কেবল বিচারের বিভিন্ন পর্যায়ের আইনি কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করেছেন। সেটাই বিশেষজ্ঞ পরামর্শকের কাজ।

আরেকটি বিষয় জেনে রাখা ভালো। বিচারক রায় লেখার কাজটি বিচার শেষ হওয়ার আগেই শুরু করতে পারেন। "বিচার শেষ হওয়ার আগেই রায় লেখা হচ্ছে!" এরকম প্রচারণা শুনলে তাই ঘাবড়ে যাবেন না। কারণ একটি বিচারের রায়ে অনেক বিষয় বিস্তরিত লেখা থাকতে পারে। একটি রায় কয়েকশো পাতারও হতে পারে। সেই রায়ের একটি অংশে কেবল বিচার কার্যের বিবরণী, ইতিহাস ইত্যাদি লেখা থাকতে পারে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায়ের প্রথম অংশে হয়তো মুক্তিযুদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা উল্লেখ থাকবে। একটি রচনার যেমন ভূমিকা লেখা হয়, সেরকম। এই কথাগুলো লিখতে বিচারকের বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সেজন্য, বিচারের রায় লেখা 'শুরু করতে' বিচারের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। রায় লিখে 'শেষ করতে' বিচারের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করা প্রয়োজন।

বিচারপতি কেন পদত্যাগ করলেন?

বিচারপতি নিজামুল হক তাঁর পদত্যাগ পত্রে ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করছেন বলে উল্লেখ করেছেন। সেইজন্য তাঁর পদত্যাগের কারণ ব্যক্তিগত ছাড়া আর কিছু বলা যাবে না।

কিন্তু যদি কেউ মনে করে, তিনি ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক কথোপকথনের তথ্য চুরি এবং প্রকাশের পর এই ঘটনার টানাপোড়েনে পদত্যাগ করেছেন তাহলে বরং মাননীয় বিচারপতি শ্রদ্ধার যোগ্য হবেন। আইনগত কোন কারণ না থাকলেও তিনি কেবল যাতে এই বিচার প্রক্রিয়া কোনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেজন্য পদত্যাগ করেছেন।

ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন এই প্রসঙ্গে কিছু বলছেন না কেন?

এটি একটি বিচারাধীন বিষয় (এবং একটা ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে)। বিচারাধীন বিষয়ে মিডিয়াতে কথা বলা সমীচীন নয় বলেই ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন এই বিষয়ে মন্তব্য করছেন না। তবে খানিকটা কাছাকাছি প্রসঙ্গে তাঁর লেখা পড়া যাবে এখানে: ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধতা জরুরী, বিভেদ নয়

সরকার রায় তাড়াতাড়ি পাওয়ার জন্য বিচারককে তাগাদা দেয়ার মাধ্যমে বিচার-প্রক্রিয়াকে অবৈধভাবে প্রভাবিত করেছে বা করার চেষ্টা করেছে। এতে বিচার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে সূতরাং পূনর্বিচার প্রয়োজন!
এখানে কি এমন কোন কথা রয়েছে যেটি প্রমাণ করে যে সরকার পক্ষ থেকে বিচারকের উপর অনুচিত/বেআইনি চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে? বস্তুত বিচার বিভাগের উপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন। তবে অবশ্যই বিচার দ্রুত শেষ করতে সরকার পক্ষের 'তাগাদা' দেয়ার বিষয়টি সঠিক। একজন জনপ্রতিনিধি যে এই বিচার দ্রুত শেষ হোক সেটি চান তাও সঠিক। যারা তাগাদা দেয়ার অভিযোগ তুলছেন তারা ভুলে যাচ্ছেন, জনপ্রতিনিধিদের কাজই হচ্ছে জনগন যেটা চায় সেটা বাস্তবায়ন করা। যুদ্ধাপরাধের বিচার জনগনের চাওয়া, জনগনকে এই বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েই এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সুতরাং জনপ্রতিনিধিরা এই বিচার দ্রুত শেষ হোক তা চাইবেন সেটিই স্বাভাবিক এবং তেমনটিই হওয়া উচিত।
এবং লক্ষ্য করুন, সরকারের কেউ চাইছে বিচার দ্রুত হোক, তারপরও কিন্তু বিচারক সেই 'চাপ'টি গ্রহন করছেন না। বিচারক এবং বিশেষজ্ঞ দুজনেরই প্রচেষ্টা হচ্ছে সরকারের তাগাদা এড়িয়ে সময় নিয়ে হলেও বিচার যেন নিয়মমত হয়, একটি শক্ত এবং স্পষ্ট কাঠামো যেন তার থাকে, বিচারের রায় যেন ছিদ্রমুক্ত হয়, সর্বমহলে গ্রহনযোগ্য হয়।


বিচারপতির পদত্যাগে তো বিচার বাতিল হয়ে গেল!

একেবারেই না। যিনি এরকম কথা বলবেন তিনি বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে জানেন না। যদি কেউ বলেন বাংলাদেশের আইনানুযায়ী বিচার বাতিল হয়ে যাবে তাহলে তিনি মিথ্যা বলছেন। কারণ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবুনালস) অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর সেকশন ৬(৬) এ বলা আছে: "A Tribunal shall not, merely by reason of any change in its membership or the absence of any member thereof from any sitting, be bound to recall and re-hear any witness who has already given any evidence and may act on the evidence already given or produced before it."


এর ভাবার্থ হচ্ছে, ট্রাইবুনালের কোনো বিচারপতির পরিবর্তন হয়ে থাকলে কেবলমাত্র সেজন্য ট্রাইবুনাল বিচারকার্য নতুন করে শুরু করতে (যেমন আবার সাক্ষ্য গ্রহন) বাধ্য নয়। ট্রাইবুনাল নতুন বিচারপতিকে/বিচারপতিদের নিয়ে তার কার্যক্রম ইতোমধ্যেই যতটুকু এগিয়েছে সেখান থেকে অব্যাহত রাখতে পারবে।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
প্রিয় পাঠক, জামায়াত শিবির তাদের বিদেশী প্রভুদের অঢেল টাকা আর সেই টাকা দিয়ে কেনা লোকবল নিয়ে জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মরিয়া হয়ে সক্রিয়। তারা ন্যায়-অন্যায় যেকোন পথে আমাদের স্বজনহত্যার বিচার বানচাল করে তাদের খুনি নেতাদের রক্ষা করতে চায়। এই সময়ে আপনার নিরবতাও জামায়াতের পক্ষে যাবে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে আপনার একটি বাক্য, একটি শব্দও এই যুদ্ধে সামিল হওয়ার অস্ত্র। এই মাটিকে আমরা কলঙ্কমুক্ত করবই। আপনি, আমি, আমরা সবাই। আপনি আমাদেরই একজন। কথা বলুন সুহৃদ। মাতৃদায় এড়িয়ে গিয়ে কে কবে মানুষ হয়েছে?

তথ্য কৃতজ্ঞতা: আইসিএসএফ।
সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: