শুক্রবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১২

ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন এবং আদিলুর রহমান খানের পরিচয় সম্পর্কিত অপপ্রচার প্রসঙ্গে

বিভিন্নভাবে অনেকবার বললে মিথ্যাও সত্যের মত শোনায়। ব্যাপক প্রচারণার এই হচ্ছে লাভ। দুঃখজনক হলেও সত্যি, যুদ্ধাপরাধের বিচার বিরোধী গোষ্ঠীর প্রচারণায় অনেক সময়ে বিচারের পক্ষে কাজ করা সমমনা ব্যক্তি-গোষ্ঠী-সংগঠনের মাঝেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সংগে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন 'অধিকার'-এর সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান শুভ্রের ঘনিষ্টতা নিয়ে একটি সাম্প্রতিক প্রচারণা  কারণ হয়েছে কিছু মানুষের কৌতূহলের। আদিলুর রহমান খান বিএনপি আমলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন, এবং পরবর্তীতে এ পদ থেকে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিকভাবে বিএনপি বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করছে। আপাত দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারবিরোধী রাজনৈতিক সরকারের সময়ে নিযুক্ত আইন কর্মকর্তার সঙ্গে ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং বিভ্রান্তির একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।


প্রশ্ন হচ্ছে, ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন কি আদিলুর রহমান খান শুভ্রকে চেনেন?

হ্যাঁ চেনেন। ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনের একজন নিরলস কর্মী। তার সঙ্গে আদিলুর রহমান খানের পরিচয় আশির দশকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে লেখাপড়ার সূত্রে। আদিলুর রহমান খান জনাব জিয়াউদ্দিনের মতোই বেলজিয়ামে আইন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। যখন বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়ক আন্দোলনের অগ্রযাত্রা শুরু হয়, সেই সময়ে বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়ক আন্দোলনে যেসব তরুণ আইনজীবী যুক্ত হন তাঁদের মধ্যে আদিলুর রহমান খান ছিলেন একজন। যখন মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন 'আইন ও সালিশ কেন্দ্র' থেকে পৃথক হয়ে 'অধিকার' নামক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনটি গড়ে ওঠে সেই সময়ে জনাব জিয়াউদ্দিন এই দুটি সংগঠনের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

মজার বিষয় হচ্ছে, জনাব জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে আদিলুর রহমান শুভ্রের পরিচয়কে ঘিরে যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন তারা বলতে ভুলে যান, আদিলুর রহমান শুভ্রের সহধর্মিনী সায়রা রহমান খান 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার তূরীন আফরোজের বন্ধু ও সহকর্মী। 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র প্রকাশনায় সায়রা রহমান নিয়মিত লেখেন। এই বিষয়টিকে মিলিয়ে কেউ যদি বলে 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি' আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার চায়না!' তাহলে সেটি নিশ্চয়ই খুব হাস্যকর শোনাবে। তাছাড়া আদিলুর রহমানের স্ত্রীর লেখা নিজের সম্পাদিত নির্মূল কমিটির কোর পাবলিকেশনে প্রকাশের মাধ্যমে তূরীন আফরোজ অন্তত এটা স্পষ্ট করেছেন যে কারও সাথে কারও যোগাযোগ থাকলেই সে স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তি হয়ে যায় না। একইভাবে সাকা চৌধুরীর ডিফেন্স টিমের এক আইনজীবীও তূরীন আফরোজের ঘনিষ্ঠজন, এই জন্যে তূরীন আফরোজকে সাকা চৌধুরির চর বলা উচিত হবে কি?

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র প্রকাশনা। [Genocide, War Crimes & Crimes against Humanity in Bangladesh: Trial Under International Crimes (Tribunals) Act, 1973. Editor: Tureen Afroz. Forum for Secular Bangladesh and Trial of War Criminals of 1971. Published in 2010].
সহজ বিষয়কে ঘুরিয়ে করা মিথ্যা প্রচারণার নোংরা অন্তঃসার সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। আমি নিশ্চিত, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিচয় রয়েছে। কিন্তু সেজন্য তাঁদের একজন আরেকজনের অনুসারী অথবা দুজনের মতাদর্শ একই, তা বোধহয় কেউ বলবেন না।


যারা ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের মতাদর্শ'কে প্রশ্নবিদ্ধ করে পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে তাদের প্রচারণার সবচে হাস্যকর অংশটি হচ্ছে, "ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন ঢাকায় গেলে আদিলুর রহমান খানের বাসভবনেই অবস্থান করেন"।

অথচ, ড. জিয়াউদ্দিন ঢাকার পুরনো বাসিন্দা। তাঁর স্বজনেরাও ঢাকাতেই থাকেন। কেউ নিজের গ্রামে গিয়ে নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য কারো বাড়িতে অতিথি হয়ে দিন কাটায় তা প্রচার করার মতো কৌতুক আর কী হতে পারে!

ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনকে ঘিরে নোংরা প্রচারণায় মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার বিরোধী গোষ্ঠী ছাড়া আর কেউই লাভবান হচ্ছে না। সম্প্রতি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের হাতে গড়া সংগঠন 'ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র দুয়েকজন মুখপাত্রকে ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন বিরোধী প্রচারণার অংশ নিতে দেখে হতাশ হয়েছি। ওনারা বোধহয় ভুলে গেছেন, এমনকি গত জানুয়ারিতেও (৩১ জানুয়ারি ২০১২) ব্রাসেলসে ইউরোপিয় পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত হওয়া ইভেন্ট "ডেলিগেশন ফর রিলেশন্স উইথ দ্য কান্ট্রিজ অব সাউথ এশিয়া"-এ 'মিটিং অন বাংলাদেশ: এক্সচেঞ্জ অব ভিউজ অন ওয়ার ক্রাইম ট্রায়ালস এণ্ড অন অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইস্যুজ' শিরোনামের আলোচনায়, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জনাব শাহরিয়ার কবীর এবং ব্যারিস্টার তূরীন আফরোজ বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন, যেখানে ড. জিয়াউদ্দিনসহ অন্য আয়োজকদের সঙ্গেও তারা আলোচনা করেছিলেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারকে এগিয়ে নিতে আইসিএসএফ জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেমন সক্রিয়, তেমনি 'ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি' তার ঐতিহ্যেই একাত্তরের ঘাতকদের বিচার কার্যক্রমের গর্বিত অংশীদার। এই সহজ সত্য যেন আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের পক্ষের মানুষেরা ভুলে না যান।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারকে এগিয়ে নিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের ঘিরে যেকোন প্রচারণা, যেকোন বিভ্রান্তি আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাহত করবে। স্বজন হত্যার বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকা বাংলাদেশের ব্যথিত মানুষেরা যেন এই সত্যটি এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলে না যান।


সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: