মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৩

আমাদের নিহত স্বজনেরা, আমাদের দুর্ভাগা দেশ

শিশু কন্যা-পুত্রদের হাত ধরে মাথা নিচু করে দুর্বল পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন মা, এই ছবিটা নিশ্চয়ই সবাই দেখেছেন। নাজি সৈন্য বেয়ার্নহার্ড ভাল্টারের তোলা এই ছবিটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের নৃশংসতার সবচে করুণ চিত্রগুলোর একটি। মায়ের হাত ধরে শিশুরা হেঁটে যাচ্ছে গ্যাস চেম্বারের দিকে। শিশুরা জানে না তারা কোথায় যাচ্ছে, মা জানেন আরো অসংখ্য শিশু-নারী-পুরুষের সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে মেরে ফেলা হবে তাদের। কী অকল্পনীয় একটি দৃশ্য, কী অবাস্তব একটি ঘটনা! অথচ তাই ঘটেছিল। শুধু একটি ক্ষেত্রে একবারমাত্র নয়, হাজারবার, হাজারভাবে! শিশু সন্তানের হাত ধরে নিয়ে মৃত্যুর দিকে যেতে একজন মায়ের কেমন লাগে? যে দুর্ভাগা মা সেই বাস্তবতার ভেতর দিয়ে গেছেন তিনি ছাড়া সেই বেদনা আর কারো পক্ষে এমনকি একটুখানিও বুঝতে পারা সম্ভব নয়! কর্পোরেট অনুভূতির যুগে মানুষের সহজ বেদনাগুলোই আমাদের স্পর্শ করে না। নিজের কন্যাকে গণধর্ষিত হতে দেখতে কেমন লাগে সেই প্রশ্নকে নিশ্চয়ই আমরা অনেকে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রসঙ্গ বলে এড়িয়ে যাই!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সীমাহীন বেদনার শেষ হয়নি। কিন্তু স্বজনহত্যার দায় মিটিয়েছে সেই সময়ের ব্যথিত মানুষেরা। বিশ্বযুদ্ধের সময়কার গণহত্যার বিচার শুরু হয় যুদ্ধের পরপরই। সেই সময়ের যুদ্ধাপরাধীদের যাদের খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, তাদের বিচারের কাজ শেষ হয় দ্রুত। যাদের পাওয়া যায়নি তাদের সন্ধান চলছে এখনো, এই ৭০ বছর পরেও।
দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের স্বজনহারা মানুষেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্বজনহারাদের মত সৌভাগ্যবান নয়। আমাদের সবচে’ গৌরবময় আর সবচে’ বেদনার যে ইতিহাস, তার বছর কয়েক পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করে এই দেশেরই সেনাসদস্যরা। ১০ বছরের শিশুকে হত্যা করার মত অসম্ভব নিষ্ঠুর হতে গেলে কী রকমভাবে কতখানি নির্দয় হতে হয় তা এই দেশের মানুষেরা কখনো বুঝে উঠতে পারবে না!
জাতির পিতা হত্যার তিন মাসেরও কম সময়ের ভেতর পরবর্তী সেনাশাসক দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয় শাহ আজিজুর রহমান নামের এক স্বাধীনতাবিরোধীকে। তিরিশ লক্ষ মৃত্যুর গুমোট বাতাস তখনো এই দেশের আকাশ ভারী করে রেখেছে। পুড়িয়ে দেয়া সহস্র গ্রামের আনাচে কানাচে আগুনের দাগ তখনও শুকোয়নি। পোড়া মাটিতে লাঙলের ফলায় তখনো উঠে আসে অভাগা মানুষের হাড়!
প্রিয় স্বদেশের দুর্ভাগ্যের দিনের সে কেবল শুরু।
যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তারা ছাড়া সকলেই জানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজিরা মানুষ মেরেছিল যত সহজে, একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষদের তত সহজে হত্যা করা হয়নি। একাত্তরে এই দেশের সন্তানদের যেরকম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে তার বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়। আমরা কেবল সেই নির্যাতনের একটুখানি শুনতে পাই, পড়তে পাই, জানতে পারি। ন’মাসের শিশুকে বুটে পিষে হত্যা  করার মত পিশাচ এই পৃথিবীতে কমই জন্মেছে। এই রকমের পিশাচ দিয়ে গঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেই সময়ে (এই সময়েও) পাশবিকতায় কালশ্রেষ্ঠ! স্বদেশের মায়েদের মেয়েদের নিয়ে সেই পিশাচ বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে যারা, দেশের সেরা সন্তানদের ধরে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে যারা, ধর্মের নামে নির্যাতন করেছে যারা, বর্ণনাতীত সেই পাশবিকতার নায়ক স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এই দেশের মাটিতে রাজনীতি শুরু করে স্বাধীনতার এক দশক পার না হতেই। স্বাধীন একটি দেশের এরচে’ বেশি দুর্ভাগ্য কি হওয়া সম্ভব?
অতি দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর এই দেশে যখন গণতন্ত্র ফিরে আসে তখন এই মাটির লক্ষ স্বজনহারা দারুণ আগ্রহ নিয়ে রাজনৈতিক সরকারের দিকে চেয়ে ছিল স্বজন হত্যার দায় মেটাবার আশা নিয়ে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্যের তখনো শেষ হয় না। এই দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি মিশে যায় স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে। যারা এই দেশের মানুষকে হত্যা করেছে, হত্যায় সহায়তা করেছে, নারী-শিশু নির্যাতন করেছে, লুট-অগ্নিসংযোগ-ভাংচুর করেছে তাদের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় আসে এই দেশের রাজনৈতিক দল। রাজাকারের গাড়িতে ওড়ে স্বদেশের পতাকা! স্বদেশের সেই কলঙ্কের সময়ের কথা স্মরণ করতেও কষ্ট হয়।
স্বজন হারানোর বেদনা আর স্বজনহত্যার বিচারের দায় নিয়ে আমাদের চার দশক কেটেছে। আর কতদিন আমরা এই দুর্ভাগ্য বয়ে বেড়াবো? আর কতদিন একটি অযোগ্য আর বেহায়া জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় তৈরি করে রাখবো আমরা? লুঙ্গি পরে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি প্রশিক্ষিত(এবং অবশ্যই বর্বর) সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মাত্র ৯ মাসে দেশ শত্রুমুক্ত করে ফেলেছে যেই দেশের ছাত্র-কৃষক-মজুরেরা, সেই দেশের মানুষ স্বজন হত্যার বিচার করেনি যুদ্ধের ৪০ বছর পরেও, নিঃশঙ্কোচে এই কলঙ্ক বয়ে বেড়ানোর মত নির্লজ্জ এই দেশের মানুষ এখনো হয়ে উঠতে পারেনি। নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী দল এবং তাদের রাজনৈতিক সহচরদের প্রত্যাখ্যান করার একটি বড় কারণ এটাই। বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার পেছনের যে জনসমর্থন তার একটি বড় কারণ ছিল এই যে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংগঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার।
তবে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের প্রশ্নে কেবল রাজনৈতিক সরকারের উপর ভরসা করে আমরা বসে থাকিনি। স্বজন হত্যার বিচার কোনো রাজনীতির অংশ নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করতে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার আর স্বাধীন বিচার বিভাগের পরেও, তাই তৃতীয় পক্ষ হিসেবে এই বিচারের অংশীদার আমরা, বাংলাদেশের স্বজনহারা কোটি মানুষ!
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার কেমন হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে সেই প্রসঙ্গে আমাদের আগ্রহ আর উৎকণ্ঠা উত্তরোত্তর বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের নানা সীমাবদ্ধতা আমাদের হতাশ করছে প্রতিদিন। যুদ্ধ পরবর্তী ৪০ বছরে নানাভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা হয়েছে। ৭১-এ আন্তর্জাতিক অপরাধে অপরাধীদের বড় অংশটি  রয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে। ক্ষমতার অংশীদার হয়ে জামায়াত সক্রিয়ভাবে তাদের অতীত অপকর্মের প্রমাণ ধ্বংস করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনিতেই নষ্ট হয়েছে কত প্রমাণ, কমে গেছে প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা। স্বজন হত্যার বিচার নিয়ে এগোনো দূরে থাক, গত ৪০ বছরে আমরা প্রতিটি দিন পিছিয়ে গেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭০ বছর পরে এখনো ‘যুদ্ধাপরাধ হয়নি’ বলা অপরাধ। যুদ্ধাপরাধ এবং তার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে মন্তব্য করা অপরাধ। আর আমাদের দুর্ভাগা স্বদেশে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী নেতা মন্তব্য করেছে, ‘দেশে যুদ্ধাপরাধী নেই, ছিল না কখনো’! দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দলের একটির নেতারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে নানামুখি বিভ্রান্তিকর মন্তব্য-বক্তব্য দিয়েছেন, এখনো দিচ্ছেন। স্বদেশের এমন দারুণ দুর্ভাগ্য দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি!
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ঠেকাতে জামায়াত দেশে বিদেশে সহস্র কোটি টাকা খরচ করে নিয়ত। তাদের ভাড়া করা একাধিক আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তাকারী সংস্থা আইনি সহায়তা দেয় তাদের, আন্তর্জাতিক মহলে মিথ্যে প্রচারণা চালায়, আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে, আন্তর্জাতিক মহলের সামনে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করে। জামায়াতের কোটি টাকার আমেরিকান লবিং ফার্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ঠেকাতে কাজ করে। তাদের আন্তর্জাতিক পাবলিক রিলেশন সংস্থা সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ঠেকাতে প্রচারণা চালায় (প্রিয় পাঠক, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম জানে না এমন ব্যক্তিদের আচমকা মানব-দরদী হয়ে জামায়াতের পক্ষে বক্তব্য দেয়ার কারণ তাদের মানব প্রেম নয়। এদের মানবাধিকার সচেতন হয়ে ওঠার কারণ জামায়াতের ভাড়া করা আন্তর্জাতিক প্রচারণা ফার্মের প্রচেষ্টা)। জামায়াতের পোষা ব্লগার, সাংবাদিক, কলামিস্ট আর বুদ্ধিজীবী দেশের ভেতরে বাইরে প্রচারণা চালায় প্রতিনিয়ত। জামায়াত-শিবিরের সহস্র ভাড়াটে কর্মী অনলাইনে-অফলাইনে প্রতিটি মুহূর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ঠেকাতে কাজ করে!
প্রথমত, আমাদের দুর্ভাগ্যে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা দারুণ সীমাবদ্ধতার ভেতরে রয়েছি। তার উপর বিচার ঠেকাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। এসব প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ঠিকভাবে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল (আইসিটি)’র যতটা সমর্থ হওয়া প্রয়োজন ছিল সেরকম সমর্থ কি এই ট্রাইবুনাল কখনো ছিল?
ছিল না, এখনো নেই! আইসিটির সীমাবদ্ধতা একটুখানি উল্লেখ করা যেতে পারে। আইসিটি’র নিজস্ব কোনও ওয়েবসাইট নেই। আইসিটি বিষয়ক প্রাথমিক তথ্যটুকু পেতে মানুষ কোথায় যাবে? এই সময়ে যে কোনও বিষয়ে প্রাথমিক ধারণার জন্য সারা বিশ্বের মানুষ উইকিপেডিয়ার নিবন্ধটি পড়ে দেখে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একজন সাধারণ মানুষ উইকিপেডিয়ার যে নিবন্ধ থেকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাটি পেতে পারতেন সেই তথ্যকে বিতর্কিত করতে দিনরাত কাজ করে যুদ্ধাপরাধীদের ভাড়াটে টেকি গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী ২৪ ঘণ্টা নিবেদিত এবং সক্রিয় (এরা কেবল আইসিটি নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল নিবন্ধ ভুল আর মিথ্য তথ্যে ভরিয়ে রাখতে দিনরাত কাজ করে।)। কে উইকিপেডিয়ায় সেইসব নিবন্ধ দিনরাত তথ্য আর তথ্যসূত্র যোগান দিয়ে ঠিক রাখে? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের নেই অত্যাবশ্যকীয় একটি ‘মিডিয়া সেল’। বিচারের স্বপক্ষের রাজনৈতিক নেতারাও ঠিক ঠিক জানেন না বলে বিভ্রান্তিকর ভুল তথ্য দিয়েছেন মিডিয়াকে। যেটি আদতে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আইসিটি’র কোনও মুখপাত্র নেই। মিডিয়া কার সঙ্গে কথা বলবে? বিচারে আগ্রহী মানুষের যে হাজারো প্রশ্ন, যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীর ছড়ানো যে হাজারো বিভ্রান্তি তার জবাব কে দেবে? বিচারক-আইনজীবী-সমন্বয়ক-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যোগাযোগের গ্রহণযোগ্য এবং নিরাপদ মাধ্যম কই? সেটি কেন তৈরি হয়নি? সরকারের মনিটরিং কেন এত দুর্বল? এরকম স্পর্শকাতর একটি বিচার, যেটির বিরুদ্ধে হাজারো মিথ্যে প্রচারণা, যেই বিচার হচ্ছে একটি নতুন আইনে, সেই বিচারের বিচারকদের সহায়তার জন্য গবেষক কই? বিচারকরা কি সারাদিন এজলাসে কাটিয়ে রাতভর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করবেন?
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার একটি কঠিন প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে যে শক্ত লোকবল এবং অর্থ সংস্থানের প্রয়োজন হয় তা সাধারণ আদালতের কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন হয় না। জটিল ব্যাখ্যায় না গিয়ে খরচের হিসেব দিয়ে এই আয়োজন বোঝাতে চেষ্টা করি। সিয়েরা লিওনের আন্তর্জাতিক অপরাধের ট্রায়ালে খরচ হয়েছে এখন পর্যন্ত ১৪৯ মিলিয়ন ডলার, কম্বোডিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধের ট্রায়ালে এই পর্যন্ত লেগেছে ১৭০ মিলিয়ন ডলার, ইয়োগোস্লাভিয়া ট্রায়ালে খরচ হয়েছে ৩০৬ মিলিয়ন ডলার আর রুয়ান্ডা ট্রায়ালে লেগেছে অন্তত ৬১৫ মিলিয়ন ডলার। এইসব দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীরা সংগঠিত, রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং অভূতপূর্ব লোকবল আর অর্থসম্পদের মালিক। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করতে তাই অন্যান্য দেশের তুলনায় আরো শক্ত আয়োজনের প্রয়োজন ছিল। অথচ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বাৎসরিক বাজেট ১.৫ মিলিয়ন ডলারেরও কম। যেই অর্থের আবার পূর্ণ সদ্ব্যবহারও করা হয় না যথেষ্ট পরিকল্পনা আর লোকবলের অভাবে।
এই বাস্তবতা মেনে নেয়া কঠিন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সামনে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে অন্য সকল ট্রাইবুনালের তুলনায় হাজারগুণ বেশি অথচ সামর্থ্যের হিসেবে আমরা অন্য দেশের শতভাগের একভাগও নই! তবে আমরা হার স্বীকার করে নেইনি। আমরা জানি প্রিয় স্বদেশের সীমাবদ্ধতা দূর করা আমাদেরই দায়! আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীর সবচে বর্বর সেনাবাহিনী আর তাদের দোসরদের সঙ্গে লড়েছেন। আমরা কি তাঁদের ত্যাগের মূল্য দেয়ার দায়টুকুও নেব না?
যারা সাধারণ, যারা স্বজনহত্যার বিচারের দায় মেটাতে চায়, যারা স্বদেশের মুখ থেকে কলঙ্ক মুছতে চায়, তাদের ভূমিকা এইখানে শুরু হয়। আমরা রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা আর যুদ্ধাপরাধী আর তাদের সহচর গোষ্ঠীর অমিত জাতীয়-আন্তর্জাতিক শক্তির কথা জেনেছি বহু আগেই। সেই সঙ্গে আমরা প্রিয় স্বদেশের নানা সীমাবদ্ধতাকে কষ্ট হলেও মেনে নিয়েছি। এইসব সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতার মাঝেই আমরা স্বজন হত্যার বিচারে সহায়তা করতে চেয়েছি, অংশ নিতে চেয়েছি। আমরা জানি, এই বিচারের দায় কেবল বিচার বিভাগের বিচারক-আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির নয়। এই বিচারের দায় বাংলাদেশের সকল মানুষের। যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীকে পরাজিত করতে হলে বাংলাদেশের সব মানুষকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে একসঙ্গে। বাস্তবতার সেই উপলব্ধি নিয়েই ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্রাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ) কাজ করে।
পাঠককে আইসিএসএফ সম্পর্কে একটুখানি জানিয়ে রাখা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার পর্যবেক্ষণ, গবেষণা, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ, দেশীয়-আন্তর্জাতিক সকল প্রচার মাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা, দেশীয়-আন্তর্জাতিক অপপ্রচারের জবাব দেয়া, জনমত তৈরি, প্রশ্ন-কৌতুহলের জবাব দেয়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান স্পষ্ট করা ইত্যাদি অনেকগুলো প্রয়োজনের তাগিদে সারা বিশ্বের তিন ডজনেরও বেশি দেশে ছড়িয়ে থাকা ছাত্র, শিক্ষক, চাকুরিজীবী, আইনজীবী, গবেষক, বিশেষজ্ঞরা মিলে শুরু হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্রাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ) এর যাত্রা। সমমনা অনেক সংগঠনও আইসিএসএফ এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করে। সত্য উন্মোচন, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে সহায়তা ছাড়া আইসিএসএফ-এর আর কোনও উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না, এখনো নেই। এই সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের প্রচার করতে একত্র হননি বলেই কোনও কৃতিত্ত্বের দাবি নিয়ে আইসিএসএফ সদস্যরা কথা বলতে আসেন না কখনো। আপাত অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও এই কথাগুলো এইজন্যে বলে রাখছি যে, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার শেষ হলে সেই কৃতিত্ত্বের ভাগ আইসিএসএফ কখনো নিতে আসবে না। বিচারে সহায়তার কৃতিত্ত্ব যেখানে যত বুলিবাজরা রয়েছেন তারা ভাগ করে নেবেন। সে তাদের ভবিষ্যতের নানা প্রয়োজন মেটাবে হয়তো। সাম্প্রতিক সময়ে আহমেদ জিয়াউদ্দিন এবং বিচারপতি নিজামুল হকের কথোপকথন চুরি এবং গণমাধ্যমে প্রকাশের পরে আইসিএসএফ এবং আইসিএসএফ এর সম্মানিত সদস্য আহমেদ জিয়াউদ্দিনকে ঘিরে ঘৃণ্য অপপ্রচার শুরু না হলে এই লেখাটিতে আইসিএসএফ প্রসঙ্গে কথা বলার কোনও প্রয়োজনই হয়ত হত না।
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার বিরোধী গোষ্ঠী যারা সুস্পষ্টতই একটি স্বাধীন দেশের বিচার বিভাগের উপর গোয়েন্দাগিরি এবং তথ্য চুরির মত ঘৃণ্য অপরাধ করেছে, এই প্রসঙ্গে তাদের প্রচারণার কৌশলটি জাঁকজমকপূর্ণ হলেও ভেতরে একেবারে ফাঁকা। একটি স্বাধীন দেশের বিচার প্রক্রিয়ায় সেই দেশের সকল নাগরিক সহযোগিতা করতে পারেন এবং করা উচিত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন এই দেশের একজন সাধারণ নাগরিকেরই দায়িত্ব পালন করেছেন। এই প্রসঙ্গে ‘কান নিয়েছে চিলে’ ধরনের নানা প্রচারণা আমরা দেখলেও ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন এবং বিচারপতি নিজামুল হকের কথোপকথনে বে-আইনি কী হয়েছে সেই কথা আমরা এখনো শুনতে পাইনি। নানা বক্তব্য-মন্তব্যে আমরা দেখছি কারো সঙ্গে সম্মানিত বিচারপতির কথোপকথনকেই একটি অপরাধ হিসেবে দেখানোর প্রয়াস চলছে। অথচ বিচারপতি নিজামুল হক অথবা ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন কেউই কোনও আইন ভঙ্গ করেন নি। তাঁদের কথোপকথনে বরং আরো স্পষ্ট হয়েছে যে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানের রাখার প্রয়াস ছিল তাঁদের। কেবল একটি রায় প্রদান নয়, রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে হলেও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটা পূর্ণাঙ্গ রায় আইনের নিজস্ব গতিতেই যেন তৈরি হয় সেই প্রচেষ্টা ছিল তাঁদের দুজনেরই। কোন আইন না ভেঙেও, বিচার প্রক্রিয়ার কোন ক্ষতি না করেও, কেবল আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার বিরোধীদের সমালোচনা এবং মিথ্যে প্রচারণার থেকে আইসিটি’কে মুক্ত রাখতে বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করলেন। এই পদত্যাগে আইসিটি একজন নিষ্ঠাবান বিচারক হারালেও তাতে বিচার প্রক্রিয়া আইনগতভাবে একটুও পিছিয়ে যায়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার বিরোধীরা যারা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিচারকের কথোপকথন এবং বিচারকের পদত্যাগে বিচার প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রচার করছেন তারা স্পষ্টতই সত্য লুকিয়ে বাংলাদেশের আইনের অপব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
আইসিএসএফ-এর সম্মানিত সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার জন্য যে পরামর্শ দিয়েছেন সে কেবল একজন বিচারককে দেয়া কোনও পরামর্শ নয়। আইসিএসএফ এর সকল কর্মকাণ্ডই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের পূর্ণ প্রক্রিয়াকে সহযোগিতার অংশ। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা আইসিএসএফ সদস্যদের সকল গবেষণা, প্রচারণা, সকল আয়োজনের উদ্দেশ্যও একই। আইসিএসএফ এর উদ্দেশ্য একটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করা, সত্য উন্মোচন এবং ইতিহাস সংরক্ষণ করা। আমার মত যে কেউ আইসিএসএফ এর ওয়েবসাইট থেকে অথবা আইসিএসএফ এর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কমর্কাণ্ড সম্পর্কে সকল প্রশ্নের জবাব পেতে পারেন। এই কথাটি এখানে নতুন করে বলে দেয়ার প্রয়োজন হত না যদি না সম্প্রতি নানামুখী প্রচারণায় আইসিএসএফ প্রসঙ্গে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হত প্রতিনিয়ত।
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার বিরোধী গোষ্ঠী তাদের নানা প্রচারণার অংশ হিসেবে যাঁরা আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের পক্ষে কাজ করেন তাঁদের মধ্যে সন্দেহ আর বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে দীর্ঘদিন থেকে। নানা লেখা, মন্তব্য, বক্তব্য আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের পক্ষে সরব ব্লগার, সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট এবং বিশেষত আইসিএসএফ সদস্যদের নিয়ে মিথ্যে প্রচারণা সেই বিভ্রান্তি তৈরির প্রচারণারই অংশ। বিশ্বাস ছিল, এই প্রচারণা চিহ্নিত করে কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবেনা, সচেতন ব্যক্তি মাত্রেই তা বুঝতে পারবেন। অথচ গভীর অবিশ্বাস নিয়ে সম্প্রতি দেখেছি যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীর এই প্রচারণা কখনো কখনো সত্যিই সফল। দেখেছি কীভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের পক্ষের মানুষেরা আইসিএসএফ এবং ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন প্রসঙ্গে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন। ‘ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের কাছ থেকে তথ্য চুরি হয়ছে’, ‘ড. জিয়াউদ্দিনই তথ্য তুলে দিয়েছেন হ্যাকারদের হাতে’ ইত্যাদি অসংখ্য জামাতি প্রচারণার সঙ্গে যখন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মত সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কণ্ঠ মেলান তখন আবার স্বদেশের সেই পুরনো দুর্ভাগ্যের ইতিহাস মনে পড়ে যায়! একাত্তরের ঘাতক দালার নির্মূল কমিটি’র সম্মানিত শাহরিয়ার কবীর বলেছেন, ড. জিয়াউদ্দিন আইন জেনে বুঝেই ট্রাইবুনালকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি যদি বলতেন আইসিটি আইনের কোথায় বলা আছে বিচারক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারবেন না? তাহলেও হয়তো তার বক্তব্য স্পষ্ট হত, বিশ্বাসযোগ্য হত। কিন্তু সত্যিকারের তথ্য ছাড়া তাঁর মত একজন ব্যক্তির একটি ফাঁকা অভিযোগ কেবল জামায়াতি প্রচারের পক্ষেই যাবে। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার বিরোধী গোষ্ঠি ছাড়া তাঁর এই বক্তব্যে আর কারো কোন উপকার হবে না। প্রসঙ্গত, বিচার প্রক্রিয়ার পক্ষে থাকতে আইসিএসএফ অথবা ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের যেমন, তেমনি আমারও বিচারের পক্ষে কথা বলতে আলাদা করে কোনও সাহসের প্রয়োজন হচ্ছে না। স্বদেশের দায়, স্বজন হত্যার বিচারের দায় থেকেই আমার এবং আমি বিশ্বাস করি আইসিএসএফ-এরও এই অবস্থান।
আমার মত, যাঁরা স্বজন হত্যার বিচার চান তাঁদের সকলের মত, আইসিএএফ সদস্যরাও আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের পক্ষে কাজ করা, স্বজন হতার বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা বাংলাদেশের সকল মানুষের সারিতে দাঁড়ানো। আইসিএসএফ সদস্যরা নিজের উদ্যোগেই আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার বিরোধী সকল প্রচারণার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেন, সকল বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেন, ভবিষ্যতেও করবেন নিশ্চয়ই। কারণ আমরা জানি, বাংলাদেশের মানুষেরা এক সারিতে না দাঁড়ালে যুদ্ধাপরাধী শ্বাপদদের নিশ্চিহ্ন করে প্রিয় স্বদেশকে কলঙ্কমুক্ত করা সহজ হবে না।
নোট: এই লেখাটিতে একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংগঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধে অপরাধীদের সরলভাবে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলা হয়েছে।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: