রবিবার, ২০ জানুয়ারী, ২০১৩

ব্যাকটেরিয়া সর্বশক্তিমান!

ধরে খেয়ে ফেলার মত দুই বৈজ্ঞানিকের কথা বলেছিলাম, মনে আছে?

মনে না থাকলে দুই লাইনে মনে করিয়ে দেই। আপনার ত্বকের কোষ নিয়ে সেটা দিয়ে আপনার একহালি যকৃত বানিয়ে ফেলা যায় (বস্তুত একহালি আপনাকে বানিয়ে ফেলা যায়) আর সেটা কীভাবে করা যায় তা দেখিয়েছেন দুজন মানুষ। যেহেতু পৃথিবীর মানুষদের শ্রদ্ধার চাইতে বেশি কিছু দেয়ার মত নেই তাই এই দু'জন মহামানবকে এবার শ্রদ্ধাভরে চিকিৎসায় নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে।


দুই লাইনে মনে করিয়ে দিলাম দুই বৈজ্ঞানিকের কথা। আর মনে করিয়ে দিলাম, মানুষের শরীরের যেকোন কোষ (যে কোষে পূর্ণ ডিএনএ আছে) নিয়ে সেটা বদলে যা ইচ্ছে করা যায়। যেমন ধরুন আপনার হৃদপিণ্ডে ক্ষত হয়েছে। নিজের ত্বকের কোষ দিয়ে দুটো বানিয়ে নিতে পারেন। একটি কোন পছন্দের বালক অথবা বালিকাকে দিয়ে দিলেন হয়তো। বিজ্ঞান হৃদয় দেয়া-নেয়ার জটিল সমস্যাকে মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এ বেশিদিন আগের কথা নয়। আগে কেবল মিথ্যা মিথ্যা হৃদয় দিতে হত। মানে বড়রকমের একটা গর্দভকে ধরে নানান বাক্যবাণে তাকে বুঝিয়ে ছাড়তে হত যে আমার হৃদয় তোমাকে দিলাম, ইত্যাদি। এইখানে বনি ব্যসলারের কথা মনে পড়ে গেল। ওনার সঙ্গে আমার হৃদয় ঘটিত কোন সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক মুগ্ধতার।

বনি ব্যসলার ব্যাকটেরিয়ার 'কোরাম সেন্সিং', মানে ব্যাকটেরিয়ারা কীভাবে কথা বলে, যোগাযোগ করে ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করেন। অতিমানবীর কাছাকাছি রকমের বিজ্ঞান বক্তৃতা দেন। এবং ভয়ানক রকমের ভালো ভালো জিনিস আবিষ্কার করেন।

উনি ওনার বিজ্ঞান বক্তৃতা প্রায়শই অণুজীব বিজ্ঞানের খুব পুরনো একটা তথ্য দিয়ে শুরু করেন। তথ্য পুরনো হলেও উনি এত চমৎকার করে বলেন যে, একই জিনিস বারবার শুনে বারবার মুগ্ধ হতে হয়। বনি ব্যসলারের বক্তৃতার সেই চমৎকার অংশটা আমার মত করে বলি।

আপনি আসলে কী?

হাস্যকর প্রশ্ন হয়ে গেল। আপনি হোমো সেপিয়েন্স। যেহেতু দিব্যি চলে ফিরে বেড়াচ্ছেন। আর নাকমুখ কুঁচকে বিজ্ঞান ব্লগ পড়ছেন।

বনি ব্যসলার বলেন, আপনি আসলে ব্যাকটেরিয়া।

শরীর বলে যে কোষীয় কাঠামোটাকে আপনি মানুষের বলে দাবী করছেন সেখানে আপনার কোষ রয়েছে যতটা ব্যাকটেরিয়ার কোষ রয়েছে তার দশগুণ!

বলতে পারেন, ব্যাকটেরিয়ার কোষ থাকলেই হবে না। আপনার জিন শরীরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে! সব কলকব্জা চালায়।

কিন্তু ওই যুক্তিও খোঁড়া। আপনার যতটা মানুষের জিন রয়েছে, আপনার শরীরের ব্যাকটেরিয়াদের রয়েছে তারচে একশোগুণ বেশি জিন। আপনার জিনেরা আপনার শরীরে যতই হম্বিতম্বি করুক, ব্যাকটেরিয়ার জিনেদের কাণ্ডকারখানার কাছে সে পাত্তা পায়না!

সুতরাং আপনি নিজেকে যতই মানুষ বলে দাবী করুন। কোষীয় হিসেবে আপনি ১ ভাগ মানুষ আর ৯ ভাগ ব্যাকটেরিয়া। জিনের হিসেবে আপনি ১ ভাগ মানুষ আর ৯৯ ভাগ ব্যাকটেরিয়া।

সব মিলিয়ে আসলে আপনাকে দুটো তথ্য দিতে চাইলাম। একটা হচ্ছে, মানুষের শরীর ব্যাকটেরিয়াদের রাজত্ব। (এই রাজত্ব থেকে বাঁচার উপায় নেই। জীবাণুমুক্ত মানুষ স্বাভাবিক পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারেনা।)

আরেকটা কথা, যেটা প্রথমেই বলেছি, মানুষের কোষ বদলে যা ইচ্ছে করা যায়। (আরো যদি বৈজ্ঞানিকভাবে বলি, তাহলে, মানুষের কোষের জিনের আচরণ বদলে যা ইচ্ছে করা যায়।)

এবার আপনাকে ব্যাকটেরিয়াদের মহাশক্তির কথা বলি। মানুষের কোষ প্রয়োজন মত বদলে নেয়া যায় সে আমরা জানি মাত্র বছর ছয়েক আগে। আর মানুষের শরীরে বসে ব্যাকটেরিয়ারা এই কাজ করছে অন্তত চার হাজার বছর ধরে! এরা মানুষেরই কোষ নিজেদের মত করে বদলে নিতে পারে বলে এই সেদিন দেখালেন তোশিহিরো মাসাকি নামের একজন গবেষক। এরপর থেকে এই বিষয়টা মনে হলেই আমি হেসে ফেলছি! কীরকমভাবে মানুষেরা ব্যাকটেরিয়ার হাতের পুতুল!

একটুখানি বিস্তারিত বলি। অনেক বৈজ্ঞানিক বিস্তারিত লিখব না। অতকিছু আমি জানিও না।

কুষ্ঠরোগের জীবাণুর নাম জানেন? মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপরি। এই বংশের আরো অন্তত একটা ব্যাকটেরিয়াকে আপনারা চেনেন। মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস। যক্ষা রোগের জীবাণু। জাঁদরেল বংশ, কী বলেন?

এরা মজার কিছু উপায়ে মানুষের শরীরের ভেতরে থাকে। কে না জানে, মানুষের শরীরের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ারা চাইলেই হেসেখেলে বেড়াতে পারেনা। মানুষের শরীরের রক্ষী কোষেরা তাদের নানা উপায়ে মারে। ব্যাকটেরিয়াদের তাই মানুষের শরীরে টিকতে হলে নানান অভিনব পদ্ধতিতে বাঁচতে হয়। এইসব উপায়গুলো নিয়ে আস্ত বই লিখে ফেলা যায়। আমি কেবল, মাইকোব্যাকটেরিয়ামের কথাটা একবারে বলে দেই। এরা শরীরের যে রক্ষী কোষ সেসবের ভেতরে গিয়ে বসে থাকে (সব প্রজাতি কিন্তু এটা করে না)। অনেকটা পুলিশের পকেটে গিয়ে চোরের লুকানোর মত।

কুষ্ঠ হলে কী হয় সে তো আপনারা জানেনই। প্রাথমিকভাবে ত্বকের অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়। আরো এটাসেটা হয়। কিন্তু আমরা ওই অনুভূতি নষ্ট হওয়ার অংশে জোর দেব। কুষ্ঠ হলে অনুভূতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণ কুষ্ঠের জীবাণু, মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপরি, শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের যে প্রান্তীয় অংশ (মানে যে অংশ প্রান্তে থাকে আরকি) সেখানের কোষের ভেতরে গিয়ে আস্তানা গাড়ে। কোষের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া আস্তানা গাড়লে যা হয়, কোষগুলো খুব নাজেহাল হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি মাসাকি দেখালেন, স্নায়ু কোষে কেবল আস্তানা বানিয়েই কুষ্ঠের জীবাণুরা থেমে থাকেনা। এদের লক্ষ্য যে স্নায়ুর বিশেষ কোষ (নিউরণ নয় কিন্তু। শোয়ান কোষ। গ্লিয়া বলে এদেরকে। শোয়ান কোষের আসল উচ্চারণটা হবে 'শ্ভান'-এর মত।)  সেই কোষের কিছু জিনের কাজে বাধা দিয়ে আর অন্যকিছু জিনের কাজে তাড়া দিয়ে, কোষটাকে বদলে ফেলে। কোষের কিছু জিনে খোঁচাখুঁচি করে সেটাকে বদলে ফেলা যায়, সে মানুষে আবিষ্কার করেছে মাত্র কয়েক বছর। আর মানুষের কুষ্ঠ হচ্ছে অন্তত ৪ হাজার বছর ধরে।

বিজ্ঞানে ব্যাকটেরিয়ার কাছে মানুষ ৪ হাজার বছর পিছিয়ে রয়েছে' বললে আপনারা কেউ কি আমার নামে মানহানির মামলা করবেন?

সাধারণ ব্যাকটেরিয়া কোষের ভেতরে ছানাপোনা দেয়া ছাড়া আর বিশেষ কিছু করে না। শোয়ান কোষে কুষ্ঠের জীবাণুরাও সবার মত ছানাপোনা দিতে পারে। কিন্তু এরা আরো যেটা পারে সেটা হচ্ছে ওই কোষকে বদলে 'স্টেম সেল' বানিয়ে ফেলতে পারে (আসলে স্টেম সেলের মত কোষে বদলে নিতে পারে)। 'স্টেম সেল', মানে 'স্টেম কোষ' কী জিনিস সে তো আপনারা জানেনই। স্টেম সেল হচ্ছে শরীরের সব কোষের প্রাথমিক অবস্থা। ময়দা যেমন রুটি-বিস্কুট-কেকের প্রাথমিক অবস্থা, সেরকম। শোয়ান কোষকে স্টেম সেলে বদলে নিতে পারলে তখন কুষ্ঠের ব্যাকটেরিয়াদের মানুষের শরীরের ভেতরে টগবগিয়ে চলতে খুব সুবধা হয়। স্টেম সেলকে শরীরের রক্ষী কোষেরা কিছু বলে না। তারা তো আর জানেনা ওই স্টেম সেলের পেটের ভেতরে রয়েছে কুষ্ঠের জীবাণু! কুষ্ঠের জীবাণুওয়ালা স্টেম সেল পেশীর ভেতরে গিয়ে পেশী-কোষে রূপান্তরিত হতে পারে।


সেই যে বলছিলাম, মাইকোব্যাকটেরিয়াম বংশের দুই জীবাণু শরীরের রক্ষী কোষেদের ভেতরে গিয়ে বাসা বাঁধতে পারে। এরা হচ্ছে যক্ষা আর কুষ্ঠের জীবাণু (আরো হয়তো অনেকেই পারে, আমার জানা নেই)। স্টেম সেলের ভেতরে থাকা কুষ্ঠের জীবাণুদের জন্য রক্ষী কোষের পেটে ঢোকা খুব সহজ হয় যায়। পেটের ভেতরে কুষ্ঠের জীবাণু ভরা স্টেম কোষেরা নাকি শরীরের বিশেষ রক্ষী কোষ, যারা জীবাণু ধরে গিলে খায় (ম্যাক্রোফেজ), তাদেরকে সংকেত দিয়ে ডেকে আনতে পারে। স্টেম সেলের বার্তা পেয়ে নাচতে নাচতে কাছে আসা রক্ষী কোষেদের তখন কুষ্ঠের জীবাণুরা চলমান ফ্ল্যাটবাড়ি হিসেবে ব্যবহার করে।

আমি মহামূর্খ। কিন্তু তবুও ধারনা করি কুষ্ঠের জীবাণু ভরা স্টেম সেল কেবল পেশী কোষ নয়, আরো অনেক কিছুতে বদলে যেতে পারে, যায়। আরো হয়তো অনেক জীবাণু এরকম মানুষের শরীরের কোষেদের বদলে নিতে শিখেছে। অনেকেই হয়তো কুষ্ঠের জীবাণুদের কাছ থেকে শিখবে। কুষ্ঠের জীবাণুরা হয়তো আরো শতেক কাজ করতে পারে মানুষের কোষকে নিয়ে। আরো অনেক জীবাণু হয়তো কুষ্ঠের জীবাণুর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জিন নিয়ে তাদের মত যাদু শিখে যাবে।

আমরা শুধু কখনো শিখবনা, মানুষকে মেরে ফেলার যথেষ্ট উপায় এমনিতেই রয়েছে, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা দরকার! আমরা কেবল গায়ের জোরে নিজেদের বুদ্ধিমান প্রাণি বলে দাবী করতে থাকবো।

মানুষ নামের প্রাণিটা হাস্যকর রকমের নির্বোধ!

যারা এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক খুঁটিনাটি জানতে চান তারা তোশিহিরো মাসাকি'র গবেষণাপত্র পড়ে ফেলুন: http://www.cell.com/retrieve/pii/S0092867412015012
যারা তোশিহিরো মাসাকির গবেষনার উপর একটা বৈজ্ঞানিক আলোচনার মত পড়তে চান তারা পড়ুন মিশাইল ভেগনেয়ারের এই লেখাটি: http://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0092867413000020
সাধারণ কোষকে স্টেম সেল-এ বদলে নেয়া বিষয়ক আবিষ্কার এবং নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার গল্পটি বিস্তারিত লিখেছিলাম। ইচ্ছে হলে পড়ুন এখানে: চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার ২০১২: জাদুকরী কোষ, কোষের জাদুকর

[এই লেখাটির জন্য হিমু ভাইয়ের কৃতজ্ঞতা পাওনা। উনি নজরে না আনলে হয়তো এই অসাধারণ গবেষণাপত্রটা নজরে আসত না। এত মুগ্ধ হওয়া হতনা। এই লেখাটাও লেখা হতনা।]

সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: