শুক্রবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

উগ্র মৌলবাদী জামায়াত-শিবির গোষ্ঠীকে প্রতিহত করতে সরকার ব্যর্থ কেন?

স্বাধীনতার বিরোধিতা করার পরেও উগ্র মৌলবাদী ধর্মভিত্তিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামী এই দেশে রাজনীতি করে। এই রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার পরেও কেবল সাধারণের ধর্মীয় অনুভূতি, ধর্মের প্রসঙ্গে মানুষের দূর্বলতাকে পূঁজি করে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকে এই দল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পরিকল্পণা করে অগনিত বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী সংগঠন ছাত্র শিবির (তৎকালীন 'ইসলামী ছাত্র সংঘ') এই দলেরই অংগসংগঠন। কিন্তু ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার ইতিহাস নিয়েও ধর্মভিত্তিক উগ্র মৌলবাদী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্রসংগঠন শিবির কীভাবে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি করছে সেই প্রসঙ্গে এই লেখাটি নয়।

ধরে নেই, কোন অজানা কারণে জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের রাজনীতি এই দেশে সিদ্ধ। সেই হিসেবে,গণতান্ত্রিক দাবী আদায়ের লক্ষ্যে তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মিছিল, প্রতিবাদও সিদ্ধ এবং গ্রহনযোগ্য। কোন রাজনৈতিক দলের অংশ না হয়ে সাধারণের জন্যেও এসব গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক অধিকারের সীমা কতটুকু?

খুঁজে দেখার প্রয়োজন পড়েনি। সকল যুক্তিতেই জামায়ার শিবির তাদের সকল গণতান্ত্রিক অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে দেশে  নৈরাজ্য তৈরি করছে, হত্যা করছে, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সাধারণের ভেতর আতঙ্ক তৈরি করছে। [] [] [] [] [] [] [] [] [] [১০] [১১] [১২] [১৩] ...

জামায়াত শিবির উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী দল। তাদের কার্যক্রম যে ঠিকঠিক গণতান্ত্রিক হবেনা সেটি বুঝতে পারা যায়। কিন্তু সে যে দলই হোক, গণতান্ত্রিক অধিকারে সীমা ছাড়িয়ে গেলে তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য সরকারের রয়েছে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। দূর্ভাগ্যজনকভাবে গত কয়েক সপ্তাহে সারা দেশে জামায়াত শিবিরের নৈরাজ্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াতো দূরে থাক বরং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরকেই নাজেহাল হতে দেখা যাচ্ছে জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাসীদের হাতে।

জামায়াত শিবির (বিশেষত শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা) সারা দেশে গত কয়েকদিনে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে সেটি ঠেকাতে প্রশাসন কেন ব্যর্থ তা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। শিবির বরং অভিনব কৌশলে নৈরাজ্য বহাল রাখছে। তারা পথচারীর বেশে হামলা করছে, চোরাগোপ্তা হামলা করেছে, বোমা ইত্যাদি অস্ত্র নিয়ে হামলা করেছে, প্রশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনী দিয়ে হামলা করেছে, পরিকল্পনা করে আচমকা একটি এলাকায় একযোগে হামলা করেছে! জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাসের হাত থেকে রক্ষায় পাচ্ছেনা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও

প্রশ্ন হচ্ছে, কোন দল/গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রম কেন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো প্রতিহত করতে পারছে না! কেন আমরা দেখছি আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই হামলার মুখে পড়ছে? এই গোষ্ঠী কি এতই শক্তিশালী যে রাষ্ট্র তাদেরকে প্রতিহত করতে অক্ষম? কতটা শক্তিশালী শিবিরের ক্যাডাররা? কতটা প্রশিক্ষিত?

যদি শিবিরের সদস্যরা সন্ত্রাসের জন্য এমনভাবে প্রশিক্ষিত হয়ে থাকে যে এই দেশের আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে কীভাবে এরা এভাবে বেড়ে উঠল? আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীর কাজ কী? তারা তাদের দ্বায়িত্ব পালনে কেন ব্যর্থ?

শিবিরের অব্যহত সন্ত্রাসের জবাবে গত কয়েকদিনে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে সরকারী দলের কাছ থেকে। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুয়েকজন কর্তাব্যক্তিও কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু এসব ফাঁকা বুলি বলেই মনে হচ্ছে। সরকারী দল আওয়ামী লীগ এবং শরিক দলগুলো জামায়াত শিবিরকে রাজনৈতিকভাবে কীভাবে প্রতিহত করবে সেটি তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এমনকি জামায়াত শিবিরের মত সংগঠনের ক্ষেত্রেও সেই সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক হবেনা সেটাই আশা করি। কিন্তু সরকার নিজে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্যে জামায়াত শিবিরের অব্যহত সন্ত্রান দমনে যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সেটি কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়। একটি স্বাধীন দেশের সরকারের জানা উচিত দেশের অভ্যন্তরের রাজনৈতিক/অরাজনৈতিক সংগঠনগুলো নৈরাজ্য সৃষ্টির কোন আয়োজন করছে কিনা। যদি আয়োজন করে থাকে তবে তা বাস্তবায়নের আগেই প্রতিহত করাও সরকারের দায়। এইক্ষেত্রে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দূর্বলতা দেশের নাগরিক সাধারণকে আতঙ্কিত করে।

একই সঙ্গে জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাস দমনে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অকৃতকার্যতা বিভিন্ন বাহিনী এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জামায়াত শিবিরের অবস্থানের কথা জানান দেয়। জামায়াত শিবির এই দেশটিকে তাদের প্রভূ পাকিস্তানীদের করায়ত করে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই তাদের দ্বিতীয় পরিকল্পনা হিসেবে বাংলাদেশকে আরেকটি পাকিস্তান বানানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত। প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে খুঁটি গেড়ে বসার দীর্ঘ মেয়াদী আয়োজনও সেই প্রচেষ্টার অংশ। আজকে এতদিন পরে এসে তাদের সেই আয়োজনের সুফল তারা পাচ্ছে কিনা সে কে বলবে!

দূর্ভাগ্যজনকভাবে এই মুহূর্তে অনেক বাক্যব্যয় করে, সময় নিয়ে জামায়াতের আয়োজনের শেকড় খুঁজতে যাওয়ার অবস্থানে আমরা নেই। বাংলাদেশ তো আর কোন উগ্র জামায়াত শিবির গোষ্ঠীর কাছে পরাজিত হতে পারে না। বিশেষত, এই গোষ্ঠী যখন এই দেশের অগণিত সন্তানের হত্যাকারী আর এই দেশের স্বাধীনতার বিরোধীদের রক্ষা করতে সচেষ্ট! এই সময়ে তাই দ্রুত এবং কার্যকরী উপায়ে জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে সরকারকেই। হিংসাত্মক কাজের তাদের সকল বর্তমান এবং ভবিষ্যত আয়োজন বন্ধ করতে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। এবং এই পরিস্তিতি সামলে উঠে প্রথম সুযোগেই একটি স্বাধীন দেশের গণতন্ত্রীয় শাসন উপেক্ষা করার দুঃসাহস তারা কীভাবে দেখায় সেটিও খুঁজে বের করতে হবে।

আর সব আয়োজনের পরে জামায়াত শিবির এবং সকল ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী সংগঠন/গোষ্ঠীকে এই দেশের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ, সরকার জামায়াতকে প্রতিহত করতে দারুণভাবে সফল হলেও সে কেবল সাময়িক সমাধান হয়ে দাঁড়াবে যদি উগ্রমৌলবাদী এইসব গোষ্ঠী এবং এর অংগসংগঠনসমূহ বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। বিদেশী শক্তি আর অর্থে লালিত মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে অবাঞ্চিত করার এই কাজে দীর্ঘ রাজনৈতিক আয়োজনের প্রয়োজন হয়ত হতে পারে। কিন্তু সেই দায়ও মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষের সকল দল-গোষ্ঠী-ব্যক্তিকে নিতে হবে। এই দায় পূরণের সময় আমরা যত পিছিয়ে দেব, ততই এইসব উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে উঠবে। মৌলবাদী গোষ্ঠীর শক্তিশালী হয়ে ওঠা যে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক কিছু নয় সে তো এই দেশের প্রতিটি মানুষ এখন উপলব্ধি করছেন জামায়াত শিবিরের নৈরাজ্য থেকেই!

সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: