মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

কাদের মোল্লার বিচারের রায়: যে কথা মনে রাখা প্রয়োজন


এটি খুবই সংক্ষিপ্ত একটি লেখা। নরপশু কাদের মোল্লার বিচারের রায় প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা না বললেই নয়।

আজ (৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ায় যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন মাননীয় আদালত। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে সংশ্লিষ্টতা এবং দুটিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে [সূত্র]।

নিঃসন্দেহে, হত্যা ধর্ষণ নির্যাতনের মত যেসব পাশবিকতার দায়ে কাদের মোল্লা অপরাধী সেসব অপরাধের শাস্তি কারাদণ্ড নয় বরং মৃত্যদণ্ড হওয়া উচিত। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, আমরা যারা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে বাঁচি, তাদের জন্য এই রায় যথেষ্ঠ নয়। আমরা কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই। আমরা জানি, হাজারোবার ফাঁসিতে ঝোলালেও এই নরপশুর শাস্তি পূর্ণ হবে না। কিন্তু তারপরও, আমরা ফাঁসির সাজাকে অন্তত একটি গ্রহনযোগ্য দণ্ড বলে মনে করি।


কাদের মোল্লার বিচারের রায় প্রকাশের পর থেকেই সকলক্ষেত্রে মানুষের প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। মানুষের দাবী, যাবজ্জীবন নয়, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই।

যাঁরা কাদের মোল্লার বিচারের রায়ে সন্তুষ্ট নন। যাঁরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নয়, বরং এই নরপশুর ফাঁসি চান তাঁদের সঙ্গে আমি আন্তরিকভাবেই একাত্ম।

কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কাদের মোল্লার বিচারের রায়ে সরকার অথবা সরকারী দলের কিছু করার নেই। কখনো ছিলও না। বাংলাদেশের আইন-আদালতের উপর সরকারের কোন প্রভাব নেই। কেবল সরকার বলে নয়, এই রায়ে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল অথবা সংগঠনের কারোরই কোন প্রভাব নেই। সুতরাং আমরা যারা বিচারের রায়ে খুশি নই, তারা যেন মনে রাখি, সরকার এই বিচারের রায় বদলাতে পারে না। তারা এই বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের তাদের সদিচ্ছা দেখিয়েছে মাত্র। কিন্তু বিচারের রায় কী হবে, কে অপরাধী অথবা কে অপরাধী নয় সেই বিষয়ে সরকার (অথবা অন্য কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী) কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। এই সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র স্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের।

ভুলে গেলে চলবে না, জামায়াত এবং তাদের সহযোগীরা দেশে বিদেশে তাদের ভাড়া করা প্রচার ফার্ম, ব্যক্তি, গোষ্ঠী ইত্যাদি সম্ভব সকল পক্ষকে ব্যবহার করে এই বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং এখনো করছে। জামায়াতের অপপ্রচারের সবচে বড় যে বক্তব্য সেটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল সরকারের প্রভাব মুক্ত নয়। এই বিচার সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আপনি-আমি যদি আজকে সরকারকে এই বিচারের রায় বদলাতে চাপ দিতে চাই অথবা আমাদের কথায়-কাজে কোনভাবে প্রকাশ করি যে বিচারের রায়ে সরকারের কোন প্রভাব থাকতে পারে, তাহলে সেটা জামায়াতের দীর্ঘ অপপ্রচারের পক্ষেই যাবে।

আমাদের হতাশা, ক্ষোভ, কষ্ট ন্যায্য। স্বজন হত্যার বিচারের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। এই কষ্ট মেনে নেয়া কঠিন। নিশ্চয়ই, আমরা আমাদের দাবীর কথা জানাবো, আমরা আমাদের দাবী উচ্চস্বরে প্রকাশ করব। কিন্তু আবেগের বশবর্তী হয়ে যেন আমরা সত্যকে ভুলে না যাই। আমাদের বক্তব্য অথবা আচরণ যেন জামায়াত-শিবির-যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীর অপপ্রচারের পক্ষে না যায়।

আমরা উচ্চস্বরে জানাতে পারি এই বিচারের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। কিন্তু আমরা যেন কখনোই না ভাবি যে, আমাদের আন্দোলনে সরকার এই বিচারের রায় বদলাতে পারে। আমরা যেন না ভাবি যে, আমাদের অথবা অন্য কারো বক্তব্য-আন্দোলনে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ প্রভাবিত হতে পারে। আমাদের আন্দোলন যেন সারা বিশ্বকে জানিয়ে দেয় যে স্বজন হত্যার বিচারের আমরা কতটা আন্তরিক। আমরা আমাদের স্বজনদের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ সাজা চাই সেটা যেন আমরা প্রকাশ করি। আমরা যেন সারা দেশে এই বিচারের সুষ্ঠতার জন্য এবং সকল অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য প্রয়োজনীয় আবহ তৈরি করে রাখি।

সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: