সোমবার, ১ এপ্রিল, ২০১৩

আমার ভাবনায় কোনো শেকল নেই। কখনো ছিলোও না।

ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই লজ্জিত এবং কুণ্ঠিত একজন মানুষ।

সাধারণ হিসেবে জীবনের অর্ধেকের খানিকটা কম সময় পার করে ফেলেছি। এবং এতোটা সময়ে আমি কেবল বেঁচে থাকা ছাড়া আর কিছু করিনি। সবাই বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকা কৃতিত্বের কিছু নয়। খাওয়া এবং বাচ্চা দেয়াও কৃতিত্বের কিছু নয়। আমি অনেক হিসেব করে দেখেছি, আমি বেঁচে না থাকলেও হতো। তাতে মানুষের কিছু আসতো যেতো না।

এতোকাল বেঁচে থাকা ছাড়া কিছুই করিনি, এই ভাবনা আমাকে প্রতিমুহূর্তে কুণ্ঠিত করে রাখে! আমি নিজের চোখের দিকে চাইতে পারিনা, লজ্জায় নত হয়ে যাই!

আমাদের অদ্ভুত এই গ্রহে এমনসব সুরস্রষ্টারা জন্মান যাঁরা নিতান্ত শিশু বয়সে সৃষ্টি করেন ঐন্দ্রজালিক সুর। আমি এতো অবাক হই যে, আমার বিশ্বাস হতে চায় না। কিছুদিন আগে হিলারি হানের বেহালা কনসার্টে গিয়েছিলাম। ক্ষীণ এক অলৌকিক মেয়ের মতো তিনি বাজাচ্ছিলেন বাখ। এখন ভাবলে মনে হয় সেটা স্বপ্নের মতো কোনো একটা ব্যপার ছিল!

প্রথমবার যখন এক বন্ধুকে ভালোবেসে ফেলেছি, আমার বিশ্বাস হতে চায়নি! বন্ধুকে বললাম, তোকে ভালোবেসে ফেলেছি। বলে আমরা দুজনেই খুব হাসলাম। এখনো সেই ঘটনা আমার বিশ্বাস হতে চায়না। মনে হয় ঘোরের মধ্যে আছি। ভালোবাসার মতো দারুণ একটি বিষয়ও হয়তো কোনো কৃতিত্বের বিষয় হতে পারতো। কিন্তু সে-ও হয়নি। যাঁদেরকে ভালোবাসা উচিত, তাঁদেরকে ঠিকঠিক ভালোবেসে ওঠা হয়না। আম্মার খেয়াল রাখার দরকার ছিল। আমি আম্মার খেয়াল রাখিনা। আম্মা আমার খেয়াল রাখেন ৯ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে। ওনার কখনো ভুল হয়না। আমার কেবলই ভুল হয়ে যায়। আমার সহোদরাদের খোঁজও আমি কিছু রাখিনা। ওরা আমার খোঁজ রাখে। ভালোবাসায় আমি নিতান্ত ব্যর্থ একজন মানুষ। ভাবলেই আমি দারুণ ক্ষীণ, নিতান্ত ক্ষুদ্র বোধ করি নিজেকে।

তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম থেকে প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য খাটে আমার বন্ধু। এন্টার্কটিকায় সিল আর পেঙ্গুইনের দঙ্গলের ভালোমন্দ খুঁজে ফেরে আমার বন্ধু। মানুষ বাঁচাতে ছত্রাকের একেকটা প্রোটিন আলাদা করে ফেলে আমার বন্ধু। আমি নিতান্ত অযোগ্য হয়েও খুব জোর করে নিজেকে তাদের বন্ধু বলে পরিচয় দিতে থাকি। বিশেষ লাভ হয়না, জানি। তবুও চেষ্টা করি। আমার আরেকটু মানুষ হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে প্রতিমুহূর্তে। অদ্ভুত এই গ্রহটাতে বেঁচে থাকার দায় মেটাতে ইচ্ছে করে। আমার খুব ভাবতে ইচ্ছে করে, আমি অকেজো আর অপ্রয়োজনীয় নই!

আমার বন্ধুরা, স্বজনেরা কতজনে এই সচলায়তনেই কী অসাধারণ লেখেন। তাঁদের শব্দের কারিকুরিতে, চিন্তার বিশালতায় আমি প্রতিমুহূর্তে মুগ্ধ হয়ে ফিরি। আমার সত্যিই তাঁদের মতো লিখতে ইচ্ছে করে। হয়না, পারিনা। আমার বন্ধু-স্বজনদের কণ্ঠে কী অলৌকিক সুর খেলা করে, কেউ কেউ কাঠ-লোহার যন্ত্রের থেকে প্রাণ সৃষ্টি করেন! আমার খুব তাঁদের মতো হতে ইচ্ছে করে।

সব ইচ্ছে পূরণ হয়না। আমার অকেজো আমিকে নিয়ে আমার সংশয়ও কখনো ফুরোয়না!

অন্য মানুষেদের নিশ্চয়ই বড়ো বড়ো অর্জন রয়েছে জীবনে। তাঁরা নিশ্চয়ই মানুষের জন্য মহান কিছু করেছেন। আমি কিছু করিনি কখনো। এতো কুণ্ঠা নিয়ে অন্য মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে আমার জানা নেই। আমি খুব ভেবেচিন্তে অসংখ্যবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমি ঠিক এই গ্রহের উপযোগি কেউ নই। এই গ্রহের সঙ্গে আমি সামঞ্জস্যপূর্ণ নই একেবারেই। আমার বেঁচে না থাকলেই হয়, সে-ই ভালো, সেটাই সহজ।

আশ্চর্যজনকভাবে আমি বেঁচে থাকি। অলীক এক তীব্র অহংকার আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। সেই অহংকার একজন স্বাধীন মানুষ হওয়ার অহংকার!

নিজেকে মানুষ ভেবে আমি ভয়াবহ অহংকারী। মানুষের করা উচিত নয়, এমন কোনো কাজ কখনো আমি করিনি। পরিচিত মানুষের সঙ্গে আমি খুব যন্ত্রের মতো কথা বলা শিখে নিয়েছি। আমি খুব ছোট আর খুব অকেজো আর খুব কুণ্ঠিত একজন মানুষ, তা আমার পরিচিতজনেরা টের পান না। আমার অহংকার আমাকে নিজেকে প্রকাশ করতে দেয় না।

নিজেকে নিয়ে এরকম ভয়াবহ অহংকারী বলেই মানুষ হবার জন্য যা যা মেনে চলতে হয় আমি সেসব অলৌকিক বাণীর মতো মেনে চলি। মানবিক বোধকে আমি মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা করে চলি। আমি নিশ্চিত, আমার অপরাধের জন্য কেউ কখনো কাঁদেনি। আমি আরেকজন মানুষকে তাঁর স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করিনা। আর আমি নিজের স্বাধীনতাও একটা স্পর্ধিত পতাকার মতো উড়িয়ে বেড়াই।

আমি খুব দূর্বল, কুণ্ঠিত আর ভীতু একজন মানুষ হলেও, আমার স্বাধীনতার প্রসঙ্গে আমি আপস করিনা। কিন্তু মানুষের স্বাধীনতার যারা বর্গা নিতে চায়, সাধারণ দৃষ্টিতে তারা খুব শক্তিশালী হয় বলে, আমার খুব ভয় করে।

এই যেমন, বিটিআরসি  সঙ্গে রয়েছে একটা দেশের সরকার। স্বদেশের সরকারকে আমার সন্মান করা উচিত ছিল। কিন্তু আমি তা করছি না। বিটিআরসি নামের প্রতিষ্ঠানটির উপর খুব ঘেন্না আর বিরক্ত লাগছে। মানুষের দীর্ঘ কাফেলার দিকে গলির কোণা থেকে ঘেউ ঘেউ করা লোমহীন কুকুর যেরকম বিরক্তি তৈরি করে, বিটিআরসি আমাকে সেরকম বিরক্ত করছে।

জানলাম, আমার ভাষা, আমার কথা, সে সত্য হোক আর না হোক, যদি কারো বিশ্বাসের অনুভূতিতে আঘাত করে তাহলে বিটিআরসি আমাকে শাস্তি দিতে পারে। আমাকে আমার কথা সত্য কিনা সেই বিবেচনা নয়, আমাকে বিবেচনা করতে হবে তা কোনো নির্বোধের বিশ্বাসকে আহত করে কিনা! আমার যা মনেহয়, আমি যা ভাবি সেই কথাগুলো আমি বলতে পারব না। আমাকে সবসময় মনে রাখতে হবে, আমার শব্দের উপর পাহারা রয়েছে। আমার চিন্তার উপর শেকল রয়েছে।

বিটিআরসির নীতিনির্ধারকরা এবং সরকারের যারা ভোটের হিসেব করেন, তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন না যে একটা মানুষ সব সয়েও কোনোরকমে বেঁচে থাকতে পারে। বেঁচে থাকা একটা মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা সে আমার মতো অকাজের বেঁচে থাকা হলেও। কিন্তু কোনো মানুষ পরাধীন হয়ে বেঁচে থাকতে পারেনা। মানুষ হবার প্রথম শর্তটি হচ্ছে স্বাধীন হওয়া। সময়ের ফেরে যেসব মানুষ পরাধীন, তাঁরাও প্রতিমুহূর্তে স্বাধীনতার জন্য ছটফট করে বাঁচেন।

আমার সত্যি এই কথাগুলো বলতে খুব ভয় করছে। কিন্তু বিটিআরসি ে না বললেই নয়, আমি আমার কথা উপর কোনো শৃংখল মেনে নিচ্ছি না। আমার বলতে খুব ভয় করছে, তবুও বলছি, কেউ যদি আমার ভাবনার জন্যে আমার উপর খবরদারি করতে আসে, সেই খবরদারির আমি পরোয়া করিনা।

আজকে জেনেছি, "আমার ব্লগ' নামের ব্লগটিতে বাংলাদেশ থেকে "প্রবেশ' বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকারের এই কুৎসিত আচরণ দেখে রাজনীতিক গোষ্ঠীর উপর ঘেন্না ধরে গেলো! কয়েকবছর আগে যখন বাংলাদেশে অগনতান্ত্রিক হাঁটু-সরকার খবরদারি করছিল, সেই সময়ে সচলায়তনে প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সেই ঘটনা আমাদেরকে অবাক করেনি। ব্যক্তির স্বাধীনতায় সকল পক্ষ আস্থা রাখবে, সেই আশা করিনা। কিন্তু সত্যিই আশা করে ছিলাম, গণতান্ত্রিক সরকার মানুষের ভাবনার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না।

আমি একজন খুব কুণ্ঠিত মানুষ। কিন্তু আমি একজন মানুষ। আমি একজন স্বাধীন মানুষ। আমি আমার ভাষার উপর, আমার ভাবনার উপর কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া নিয়ম মানছি না। আর কারো ভাষার উপর, ভাবনার উপর শৃংখল চাপিয়ে দেয়া হলে আমি সবসময়ই তাদের পাশে রয়েছি।

এই সময়ে যাঁরা ভাবনার মুক্ততা নিয়ে আপোষ করেন না, তাঁদের কী হবে ঠিক জানা নেই। কিন্তু আমরা যে সকল সময়ে রয়েছি এবং সকল সময়ে থাকবো, সেটা আমি ইতিহাস থেকে জেনেছি। বস্তুত ইতিহাসের পাঠ থেকে সাহস নিয়েই আমি আমার সকল ভয় আর দূর্বলতা উপেক্ষা করে এই লেখাটি লিখছি। আমি বোধ করি, মানুষের স্বাধীনতার উপর খবরদারি করতে যাওয়া উজবুকদের অন্তত খানিকটা ইতিহাসের পাঠ নেয়া উচিত। তাদের নিজেদের স্বার্থেই।

মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মুক্ত। এই সহজ সত্য যারা বুঝতে পারেনি, ইতিহাস এইসব উটকো উজবুকদের বিষয়ে খুব সুখকর কথা বলেনা।

সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: