রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৩

নরমাংসখোর

নরমাংসখোর সাহিত্যিক এবং সাহিত্য-সম্পাদক,

সমকামীতা কোনো অপরাধ নয়, সমকামিতা প্রকৃতিতে অলীকও নয়। সমকামিতা খুবই সাধারণ এবং সহজ আচরণ।

আমাদের সমাজব্যবস্থা অবশ্য আমাদেরকে অন্য কিছু শিখিয়েছে। সমকামিতাকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছে, সমকামীদের ছোট করতে শিখিয়েছে। এবং সবকিছুর ওপর, সমকামীদের শাস্তি দিতে শিখিয়েছে। কারো ক্ষতি না করেও মানুষ তার আচরণে স্বাধীন নয়, এরচে খারাপ বিষয় আর কী হতে পারে বলুন?


সমকামিতাকে অপরাধের কাতারে ফেলতে সবার আগে যে যুক্তি তৈরি হয়, সেটি হচ্ছে প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ! অথচ আপনারা নিশ্চয়ই জানেন প্রকৃতি নিয়ে বাণী ঝাড়া প্রকৃতির এইসব সন্তানেরা জানেই না যে সমকামিতা একশোভাগ প্রাকৃতিক।

উদাহরণ দেই, জিরাফের ভেতরে যত যৌনতা দেখা যায় তার ৯০ ভাগই দেখা যায় পুরুষ এবং পুরুষ জিরাফের ভেতরে। বনোবোরা তো শতকারা ৬০ ভাগই সমকামী। চালের পোকার মতো কয়েকরকমের পোকার ভেতরেও এরকম দেখায় যায়। মেয়ে গ্যালাপাগোস অ্যালবাট্রসেরা (Phoebastria irrorata) বছরের পর বছর জুটি বেঁধে সংসার করে। নারী জুটির সেই সংসারে পুরুষের ঠাঁই নেই। শতকারা অন্তত ৮ ভাগ ভেড়া সমকামী। হাতি, সিংহ, বানর, হায়েনা এসব প্রাণীতেও সমকামিতা খুব সাধারণ বিষয়। কাঁটাবনের পাখির দোকানগুলোতে যে ছোট ছোট ঠোঁটের ফিঞ্চ পাখি দেখা যায়, যেগুলো তাদের জুটির সঙ্গে সারাদিন খুনসুটি করে বেড়ায়, এগুলো কিন্তু বেশিরভাগই পুরুষের জোড়া। এদের ভালোবাসা এত শক্ত যে, মেয়ে ফিঞ্চ এদের কাছে এলেও পাত্তা পায় না! পাখিদের ভেতরে কবুতর, শকুন, হাঁসের বিভিন্ন প্রজাতি, পেঙ্গুইন এরকম শতেক পাখি সমকামী। আর এতে তাদের তাদের সৌন্দর্যে আর স্বাভাবিকতায় কোনো কমতি হয় না।

তাই বলছিলাম, সমকামিতা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কিছু নয়। প্রকৃতির প্রতিটি কোণে কোণে সমকামিতা দেখা যায়। সবই নির্জলা ভালোবাসা। কিন্তু কি জানেন, প্রকৃতির অনেক আচরণই সমাজবদ্ধ মানুষের জন্য সঙ্গত নয়! সে আমি জানি। জানি, তার সরল যুক্তিযুক্ত কারণও রয়েছে। কেউ ডাল খাবে নাকি সবজি খাবে সে তার নিজের বিচার। কিন্তু কারো মুখেরটা কেড়ে খেতে পারবেনা  কেউ। কারো গলায় ছুরি বসিয়ে খেতে পারবেন কেউ। কে কী করবে সে তার সিদ্ধান্ত, যার যেভাবে ভালো লাগে সে সেভাবেই বাঁচবে। কেবল অন্য কারো ক্ষতি না করে।

সমকামিতা সেজন্য স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ক্যানিবালিজম নয়।

ক্যানিবালিজম। বাংলায় যাকে বলে স্বজাতির মাংস খাওয়ার অভ্যেস। জানি বলবেন, প্রকৃতিতে ক্যানিবালিজম দেখা যায়। সে আমিও জানি। সমকামিতার মতো প্রকৃতির প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে নয় বটে, কিন্তু প্রকৃতিতে অনেক প্রাণিই স্বজাতির মাংস খায়। যেমন ধরুন কয়েক প্রজাতির মাকড়সা, লম্বা লম্বা পা-ওয়ালা গঙ্গাফড়িং, ঝিঁঝিঁপোকার মতো কিছু পোকা, কিছু কিছু মাছ আর কেঁচো জাতিয় প্রাণিরা স্বজাতিকে শিকার করে খায়। কিন্তু স্বজাতিতে যে-ই যাকে মেরে খাক, সে কখনো দুপক্ষের ইচ্ছেতে হয়না। একপক্ষ আরেকপক্ষকে শিকার করে খায়। আর সেই কারণেই আমরা মানুষেরা স্বজাতির মাংস খাওয়াকে অন্যায় বলে মানি।

নিতান্ত কঠিন মানসিক রোগী ছাড়া নরমাংসখোর মানুষ এই পৃথিবীতে এখন আর নেই। আমি খুব সাধারণ বিজ্ঞান ব্লগ লিখি আর সেও লিখি কেবল শখের বশে। তাই সাহিত্য করে ভাষার মারপ্যাঁচে বুঝিয়ে বলার অভ্যাস নেই। সে বরং অনর্থক জটিলতা বলে মনে হয়। তাই মোদ্দা কথাটা যা বলতে চাইছিলাম সেটা বলি, মানুষের সমাজে নরমাংসভোজ স্বাভাবিক বিষয় নয়।

কিন্তু কি জানেন, আজকাল মানুষের ভেতরেই সেই মানুষের মাংসখোরের আত্মা দেখে চমকে উঠি। সময় বদলেছে। ক্ষুধার তাড়নায় না হলেও, ব্যবসার প্রয়োজনে নরমাংসখোর মানুষ দেখি চারপাশে। মানুষের চামড়ার ভেতর থেকে হরহামেশা বের হয়ে যায় মানুষ খাবলে খাওয়া নেকড়ে! খুব ভয় করে বুঝলেন, আর খুব ঘেন্না লাগে! কিন্তু যেকথাটা বলতে আজকে লিখছি, সত্যি বলছি, আপনাদের আগে, এত নিপুণ মুখোশে লুকোনো নরমাংসখোর দেখিনি!

আজকে ঘুম থেকে উঠে দেখি এদেশের সবচে বড় পত্রিকাগুলোর একটাতে আপনারা একটা গল্প লিখে ছেপেছেন। আমার পড়তে ভুল হয়নি। নিজের মায়ের ভাষাটা পড়ে বুঝবার মতো অন্তত আমার জানা রয়েছে। সেই গল্প পড়ে দেখলাম, সে ঠিক গল্প নয়। সেখানে আমার বোনের কাঁচা মাংস খাবলে খাওয়ার বর্ণনা রয়েছে। সারা শরীরের চামড়া-মাংস উঠে যাওয়া আমার বোনের ছটফট করে মোচড়ানোর শরীর টের পাওয়া যায় সেই গল্পের ভাঁজে ভাঁজে। আমি প্রাণের ভেতর এক অসম্ভব আতঙ্ক নিয়ে ঘুরছি এই লেখা পড়ে। কী অসম্ভব কল্পনাবিলাস! নরমাংসের তৃপ্তি পেতে কাগজ কলম খামচে সে কী প্রাণান্ত প্রচেষ্টা!

আমি খুব ভয় পেয়েছি বুঝলেন, আর আমার খুব ঘেন্না লাগছে। উঠতি বয়সে নারীর শরীর আর যৌনতার আগ্রহে লুকিয়ে পড়তাম যৌনতার গল্পের বই। কারো কাছে সে খানিকটা অধঃপতন হলেও বড় পাপ বোধহয় মনে হয় না। কিন্তু এরকম তীব্র আতঙ্ক আর ঘৃণা জাগানিয়া আকাঙ্ক্ষা কারো থাকতে পারে তা জানা ছিল না। আজকে জানতে পেরেছি, আপনারা (যাদেরকে আমাদের খুব বড় এক সাহিত্য-সম্পাদক আর খুব বড় এক সাহিত্যিক হিসেবে চিনতাম) জীবন্ত শরীর থেকে কামড়ে নিয়ে কাঁচা নরমাংস খাওয়ার আকাঙ্খা লালন করেন। এই আকাঙ্ক্ষা এতো আতঙ্কের যে, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। জীবন্ত কিশোরীর শরীর থেকে কামড়ে নিয়ে কাঁচা নরমাংস চুষে খাওয়ার গল্প বাজারে পড়তে পাওয়া যায় না বলেই কি নিজেরা লিখে ছেপে দিলেন? আর যখন কেবল কল্পনা মৈথুনে তৃপ্তি হবে না তখন?

আমি খুব ভয় পেয়েছি। আর খুব ঘেন্না লাগছে। কিন্তু আমি পালাচ্ছি না। বরং সতর্ক হচ্ছি। সহজ সাধারণ মানবিক বোধ ছাড়া আমার আর কিছু নেই। সেজন্য আপনারা কেউই আমাকে চিনবেন না। কিন্তু আপনাদেরকে আমি চিনে রাখবো। যৌনমিলনের সময়েই সঙ্গীর শরীর ছিঁড়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলা পোকাগুলোকে যেভাবে চিনে রাখি, আপনাদেরকেও আমি সেইভাবে চিনে রাখবো।

সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: