মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৩

কীভাবে একটি পঙ্খীরাজ ঘোড়া তৈরি করবেন

পঙ্খীরাজ ঘোড়া তৈরির চিন্তা আমার মাথায় তৈরি হয় সম্ভবত একটা রুপকথার গল্পের অনুপ্রেরণা থেকে। তবে এই জিনিসের সাধারণ যে রূপকথা আমরা জানি সেই গল্প থেকে নয়। রাজপুত্তুর পঙ্খীরাজে চড়ে গিয়ে রাক্ষস মেরে রাজকন্যাকে উদ্ধার করল সেই চিন্তা কারো কাছে শিশু বয়সেও বাস্তব (সম্ভাব্য) মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। যে গল্প পড়ে মনে মনে ভেবেছিলাম, ঘটনাটা সত্যি হলে মন্দ হতোনা, সেটা অন্য গল্প। কে লিখেছেন অথবা আদৌ সেটি কোনো প্রচলিত রুপকথা কিনা জানা নেই। কেবল মনে আছে গল্পটা।


সেই গল্পে এক কৃষকের তিন ছেলে ছিল। তিন ভাইয়ের বড়দুটি দস্যুপনা করে বেড়ায়। ছোটটি শান্ত, নরমসরম। একরাতে তিনভাই মিলে বাড়ির পাশের মাঠে কৌশলে ধরে ফেলল এক ঘোড়া। সেই ঘোড়ার বোধহয় বিশেষ ক্ষমতা থেকে থাকবে, সে তিন ভাইকে বলল, পরবর্তী কোনো একদিন তার তিনটে বাচ্চা হবে। সেই তিনটে বাচ্চা সে তাদের তিনভাইকে দিয়ে দেবে যদি তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এই হচ্ছে ঘটনা। বড় ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিয়ে তারা তিনভাই পেলো তিনটে ঘোড়ার বাচ্চা। তিনটে বাচ্চার বড়দুটো স্বাস্থবান, চকচকে। ছোটটি বেঁটে, কুঁজওয়ালা। সেটিই ওই ছোট ছেলেটির ভাগে জুটলো। গল্পের এই পর্যায়ের কাহিনী নতুন কিছু নয়। দেখতে অনাকর্ষনীয় হলেও ছোট ঘোড়াটির নানা গুণ ছিল। ছোট ছেলেটকে নিয়ে সে উড়তে পারত, কথা বলতে পারত। নানা বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করত। আমি ভাবতাম, আমার এরকম একটা ঘোড়া হলে মন্দ হয়না।

অনেক অনেক অনেকদিন পরে আমার সত্যি সত্যি মনে হল, একটা পঙ্খীরাজ ঘোড়া বানিয়ে ফেলতে সমস্যা কী? বুঝলাম, সমস্যা রয়েছে, আমার সেই ল্যাবরেটরি নেই। সেই জ্ঞানও নেই। জ্ঞান হয়তো কুড়িয়ে নিতাম, ল্যাবরেটরি কোথায় কুড়োবো? পঙ্খীরাজ ঘোড়া তাই তৈরি হতে লাগল কল্পনায়। সেই কল্পনার খানিকটা এইখানে লিখছি।

পঙ্খীরাজ হতে হলে তার কী কী গুণ থাকতে হবে?

১. তার ডানা থাকতে হবে।
২. তাকে সেই ডানা ঝাপটে উড়তে হবে।

প্রথম কাজটি সহজ। পরেরটির তুলনায় অসম্ভব রকমের সহজ। একটি ঘোড়ার ডানা তৈরি আসলে খুব কঠিন কিছু নয়। এই সময়ে জীববিজ্ঞানের প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব। এইরকম জিনিস তো আরো পনেরো বছর আগে থেকেই একটা একটু হচ্ছে। ভ্যাকানটি ইঁদুরের কথা মনে আছে আপনাদের? যে ইঁদুরের পিঠে একটি মানুষের কান ছিল?

ইঁদুরের পিঠের ওই কানটি আসলে মানুষের কান নয়। গরুর তরুনাস্থি-কোষ ব্যবহার করে ওটা বানানো হয়েছিল আর তারপর একটা ইঁদুরের পিঠে জুড়ে দেয়া হয়েছিল ওটাকে বাঁচিয়ে রাখতে। সে পনেরো বছর আগের কথা। এই সময়ের বিজ্ঞান আরো উন্নত। এখন একটা মানুষের কানই ল্যাবরেটরিতে বানানো যেতে পারে। সেই হিসেবে, জুতসই পাখির পাখা বানানোও কঠিন হওয়ার কথা নয়। সরাসরি সেই চেষ্টা করা হচ্ছেনা বলে, কিছুদিন গবেষণা করতে হবে ঠিক। কিন্তু জেনেটিক্সে যে অসম্ভব উন্নতি আমরা গত দশ বছরে করেছি তাতে এইসব নিয়ে চিন্তিত হওয়া আর সাজেনা। আপনি যে এই লেখাটি পড়ছেন, আপনার একটা কোষ থেকে আপনার দুটো হৃদপিণ্ড আর চারটে পা বানানো যায়, জানেন তো? যাদু মনে হচ্ছে? গতবছর যে কোষের জাদুকরদের নোবেল পুরষ্কার দেয়া হলো, সেই ওই যাদু দেখানোর জন্যেই। (পুরনো একটা লেখা আছে, পড়তে পারেন এখানে।)

সুতরাং ডানা বানানো কঠিন কিছু নয়। ঘোড়ার উপর (আমাদের প্রয়োজনীয় বিষয়ে) খুব কঠিন গবেষণা করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু কয়েকবছর গবেষনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। আর তখন ঘোড়ার পিঠে দুটো ডানা জুড়ে দেয়াও অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দ্বিতীয় ধাপে। ঘোড়ার পিঠে ডানা জুড়ে দিলেই হবেনা। সেই ডানা ঝাপটে তাকে উড়তে হবে!

এইখানে এতো এতো সমস্যার মুখোমুখি হবো আমরা যে বারবার মনে হবে, না এ সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা সকল সম্ভব্য পথ বিবেচনা না করে থামবো না। এমনকি যখন সকল সম্ভাব্য পথ বিবেচনা করে দেখবো যে এ সম্ভব নয়। তখন আমরা সেই অসম্ভব অংশগুলো কেন সম্ভব নয় তা খুঁজে বের করে তার সমাধান করব।

আমাদের পঙ্খীরাজের ডানা মেলে উড়তে সবচে বড় সমস্যাগুলো হচ্ছে, সেই ডানার ক্ষমতা, ঘোড়ার শরীরের সঙ্গে তার সামঞ্জস্যতা, প্রয়োজনিয় ঐচ্ছিক পেশী আর অতি অবশ্যই সেই পেশী সঞ্চালনের তাগিদ।

ক'দিন আগের এক ঘটনা বলি। "গেইম অফ থ্রোন্স' সিরিয়ালটা আমার খানিকটা পছন্দের। বিশেষত এমিলি ক্লার্কের অংশটুকু। এমিলি ক্লার্কের তিনটে ড্রাগন রয়েছে। যতদূর মনে পড়ছে, দ্বিতীয় সিজনে, তখনো সেই ড্রাগনের বাচ্চাগুলো বড় হয়নি। এইটুক একেকটা বাচ্চা। কিছু হলেই ডানা ঝাপটে খাওমাও করে। দেখে ভয় পাওয়ার চেয়ে বেশি আদর লাগে। ড্রাগনের বাচ্চাগুলো দেখে এতো ভালো লেগে গেল যে, একটা ছবি ফেসবুক কাভারে দিয়ে দিলাম। কিন্তু পরে কাভারের সেই স্থিরচিত্রে ভালোমতো নজর পড়তেই মনটা খারাপ হলো। এমিলি ক্লার্কের কাঁধে ড্রাগনের বাচ্চাটার ডানাগুলো যেরকম, তাতে সেটা কখনোই উড়তে পারবেনা। তার শরীরের যে আকার, সেই আকারের সঙ্গে তার ডানার গোড়ার দিকের অংশ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ওটা তার শরীরের ভার বইতে পারবে না! ড্রাগনটার দুই পায়ের একটা আবার রুগ্ন! গ্রাফিকসে তাকে বানানো হয়েছে। এতোকিছু ভেবে বানানো হয়নি বলেই তাকে রুগ্ন আর ওড়ার ক্ষমতাহীন মনে হয়। কিন্তু ভেবে খারাপ লাগলো, এমনকি অন্তত কল্পনাতেও ওই ড্রাগনের বাচ্চা উড়বে না! কল্পনাতেও ব্যর্থ হলে কেমন লাগে!

আমাদের পঙ্খীরাজের প্রসঙ্গে ফেরত আসি। আমরা যখন পঙ্খীরাজ বানাতে চেষ্টা করছি তখন আমাদের সামনে প্রথম সমস্যাটি ডানা তৈরির। সেটি খুব সহজ। অন্তত তুলনামূলকভাবে। পরের সমস্যাটি ধাক্কা দিয়ে হিমালয় সরানোর মতো। কী কী করতে হবে দেখুন,

১. ঘোড়ার ডানা হতে হবে তার শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমন যেন, সেটা দিয়ে শক্তিপ্রয়োগ করে সে তার পুরো শরীরকে উড়িয়ে নিতে পারে।
২. সেই ডানা ঝাপটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অস্থি আর পেশি থাকতে হবে ঘোড়াটির।
৩. সেই ডানাটি ওইসব পেশি আর হাড়ের সঙ্গে মিলিয়ে শরীরে প্রতিস্থাপন করতে হবে এমনভাবে যেনো ঘোড়াটি সুস্থ থাকে।
৪. সেই ডানা ঝাপটে ওড়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকতে হবে ঘোড়াটির।
৫. ডানা ঝাপটে ওড়ার ইচ্ছে থাকতে হবে তার। সহজ হিসেব, আপনি চাইতে পারেন, কিন্তু ঘোড়া নিজে কেনো উড়তে চাইবে? তার ওড়ার কী প্রয়োজন? তার তো সেই প্রাকৃতিক অভ্যাসও নেই।
৬. ইত্যাদি ইত্যাদি...

সত্যিকার অর্থে বিবেচনা করলে, এই কাজগুলো বিজ্ঞানের এই পর্যায়ে সম্ভব নয়। অন্তত আমরা যেভাবে ভাবছি সেভাবে নয়। যেমন ধরুন,  ঘোড়ার কাছাকাছি উড়তে সক্ষম প্রাণি হচ্ছে বাদুড়। কিন্তু আমি নিশ্চিত, আমরা এতক্ষণ পাখির পাখার মতো কোনো ডানা তৈরি করে দেয়ার কথা ভাবছিলাম আমাদের পঙ্খীরাজকে। বাদুড়ের ডানাওয়ালা পঙ্খীরাজ হলে তার মধ্যে স্বপ্ন-স্বপ্ন ব্যপারটি থাকেনা, তাইনা? (তবে সেরকম যে করা যাবেনা তা নয়।)

অন্য প্রসঙ্গগুলো একটু দেখি, ঘোড়া পাখিদের (অথবা উড়তে সক্ষম প্রাণীদের) থেকে এতো দূরে অবস্থিত যে তার শারীরিক গঠন উড়বার এমনিক ধারেকাছেরও নয়। তার শরীর ভারী, তার পেশি এবং হাড়ের গঠন ওড়ার উপযোগী নয়। যেমন দেখুন, দেখতে পাখি আর ঘোড়ার হাড়ের গঠন একই মনে হতে পারে। কিন্তু বস্তুত পাখির হাড় বহুগুণে হালকা। ঘোড়ার শরীর যেমন ভারী, সেটাকে উড়িয়ে নেয়ার মতো ডানা বানালে সেটাও হবে মারাত্মক রকমের বিস্তৃত আর ভারী। আমার অ্যরোনটিক্সের কোনো জ্ঞান নেই। পদার্থবিজ্ঞানেরও নেই। কিন্তু সাধারণ জ্ঞান থেকেই এটা আন্দাজ করতে পারি।

ঘোড়ার ওজনের সঙ্গে মিলিয়ে অনেক বড় আর ভারী ডানা তৈরি খানিকটা অসম্ভব। এমনকি এই সময়ের বিজ্ঞানেও। এতো হাজারো সমস্যা রয়েছে যে তা সবগুলো এমনকি লেখাও সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা কল্পনায় আমরা চেষ্টা না থামাই। ধরলাম, সেই বিশাল ডানা তৈরি করা গেল। এখন?

সেই ডানাকে ঘোড়ার শরীরে কেথায় লাগাবেন? ইঁদুরের পিঠে কান লাগিয়ে দেয়ার মতো হলে হবেনা! ডানাকে এমনভাবে লাগাতে হবে যেন সেটা ঘোড়া ব্যবহার করতে পারে। সেজন্য সেই ডানায় এবং তার সংযোগস্থালে থাকতে হবে যথেষ্ট ঐচ্ছিক পেশি। সেই পেশি কোথায় পাবো আমরা? আর পেলেও, এমন একটি অজানা অঙ্গ ঘোড়ার শরীরে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা একঝটকায় প্রত্যাখ্যান করবে। শক্ত ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট (যে ওষুধ ইমিউন সিস্টেমকে দূর্বল করে ফেলে) দিয়ে খুব ঝুঁকি নিয়ে সেটা করা গেলেও ঘোড়াকে উড়তে শেখাবে কে? সে কেনই বা শিখতে চেষ্টা করবে? তার বরং কষ্ট হবে ওই ডানা বয়ে বেড়াতে। তার হৃদপিণ্ড, পাকস্থলী, সংবহনতন্ত্র, লসিকাতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র আরো কতো এটাসেটা সবই কি একঝটকায় আমাদের জুড়ে দেয়া সেই ডানাকে গ্রহন করে নেবে, আর সেটাকে বাঁচিয়ে রাখবে? উহুঁ, কোনো সম্ভাবণা নেই।

তাহলে?

ভাবনার পথ বদলানোই বোধহয় ভালো!
কেমন হয় যদি একটা ঘোড়া জন্মানোর সময়েই একজোড়া ঝলমলে ডানা নিয়ে জন্মায়? এটা বস্তুত আমাদের সমস্যাগুলোর অর্ধেক কমিয়ে দেবে। আর জীববিজ্ঞানের আজকের ক্ষমতার দিকে তাকালে তাত্ত্বিকভাবে এটা সম্ভবও। কিন্তু বাস্তবে?

আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। সলিড সাধারণ ধারনার উপর ভর করে ভাবছি। বিবর্তনের হিসেবে ঘোড়ার সঙ্গে পাখিদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বহু আগে। তাদের ভেতরের দূরত্বের হিসেবে তাদের ডিএনএ-তে একটুখানি পরিবর্তন করেই ঘোড়ার ডানা গজানো সম্ভব নয়। অনেকখানি পরিবর্তন করে সম্ভব হলেও, সেখানেও সেই পুরনো অনেকগুলো সমস্যা তৈরি হবে।

প্রথম অংশটুকু নিয়ে খানিকটা বলে নেয়া দরকার। ঘোড়ার জেনেটিক্স নিয়ে আমরা যা জানি, সেই জ্ঞান একটি ঘোড়ার ডানা তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়। কেবল একটি নয়, অনেকগুলো মিউটেশনের প্রয়োজন হবে ডানা তৈরি করতে। আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার সমস্যা তৈরি হবে, প্রতিবন্ধকতা দেখা যাবে। সেসব সমস্যার সমাধান করতে অসম্ভব রকমের গবেষণা করতে হবে। আশার কথা হচ্ছে, তাত্ত্বিকভাবে, সেটা করাও সম্ভব। কিন্তু এই গবেষণার সবচে বড় সমস্যাটি হয়ে দাঁড়াবে, সময় এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। একটি ঘোড়ার জন্ম এবং বেড়ে ওঠার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন, সেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সম্ভাব্য পরীক্ষণের ফল পেলে আমাদের চলবে না। সেক্ষেত্রে আমরা অন্তত কেউ জীবদ্দশায় এই গবেষণার ফল দেখে যেতে পারবনা। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও পারবে কিনা  কে জানে। বিজ্ঞান যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে আমরা আশা করতে পারি আগামী দশকেও আমরা অকল্পনীয় উন্নতি দেখব জীববিজ্ঞনের বিভিন্ন শাখায়। তখন হয়তো আমার এই হিসাব বদলাবে। কিন্তু যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সময় সবচে বড় সমস্যা। এর পরবর্তীতে রয়েছে সামাজিক বাধা। সারা পৃথিবীতেই নানা পর্যায়ের বিজ্ঞানের গবেষণায় বাধা দেয়া হয়। জেনেটিক্স, ক্লোনিং এবং স্টেম সেল গবেষণার সবচে বড় বাধাগুলো আসে মূর্খ ধর্মীয়গোষ্ঠিগুলোর থেকে। এই শ্রেণি মহা আড়ম্বরে বিজ্ঞানের বিরোধিতা করে। অথচ বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির সহায়তা বন্ধ করে দিলে এরা ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ইতিহাস হয়ে যাবে!

ওই প্রসঙ্গে না যাই। অন্ধ-মূর্খ শ্রেণিকে যুক্তি শোনাতে যাওয়া নির্বুদ্ধিতা। আমরা বরং আমাদের পঙ্খীরাজ তৈরিতে মনোযোগ দেই।

বাস্তবের সমস্যাগুলো এড়িয়ে তাত্ত্বিকভাবে, একটি ঘোড়ার জন্ম দেয়া সম্ভব, যেটির ডানা থাকবে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হবে তার ডিজাইনে। আমাদের পঙ্খীরাজের ডানা আমরা কীভাবে ডিজাইন করব? ডানা ঘোড়াটির কোন অংশে থাকবে? কোন পেশির শক্তিতে সেটি চলবে? নিঃসন্দেহে সেসবও আমাদেরকেই ডিজাইন করতে হবে। সেই ডিজাইনের ক্ষমতা আমাদের এই মুহুর্তে নেই। বাস্তবে নেই। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে রয়েছে। মানুষ প্রাণ সৃষ্টি করতে পারে, করেছেও। একটি প্রাণির গঠন বদলে দেয়া আধুনিক জীববিজ্ঞানে নিতান্তই সহজ।

কঠিন অংশটি হচ্ছে, কোনো কৃত্রিম অঙ্গকে কর্মক্ষম করা। কিন্তু আমরা যেহেতু কল্পনা করছি, এবং আমরা জানি, কল্পনাতে হলেও আমরা যেটি করতে চাচ্ছি তা কোনো সহজ বিষয় নয়, সুতরাং আমরা সকল সম্ভাবণাই বিবেচনা করব। সে এমনকি অতিক্ষুদ্র আর অতিতুচ্ছ হলেও।

ঘোড়ার ডানাকে কর্মক্ষম করার একটি সম্ভব্য উপায় হচ্ছে, তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া। শিশু থেকেই তাকে ডানার উপর নির্ভরশীল করে তোলা। সেটি সহজ নয়। বস্তুত সম্ভবও নয়, যদিনা তার ডিএনএ-তে অসম্ভব রকমের পরিবর্তন আনা হয়। সেই অসম্ভব পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলে তারপর তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। ঘোড়ার (আকার আয়তনের) বৃদ্ধি কমিয়ে এনে তার প্রজননের সময় যদি কমিয়ে আনা যায় তাহলে সেই পরীক্ষণ সহজ হবে। সেক্ষেত্রে প্রজন্মের পর প্রজন্মে তাদেরকে ডানার উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠার প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। সেই প্রশিক্ষণ সহজ হবেনা। প্রায় অসম্ভব হবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও একটুখানি হলেও তা সম্ভব।

মূল কথাটি যা বলতে চাইছিলাম, একটি অথবা একঝাঁক পঙ্খীরাজ তৈরি করা অসম্ভব নয়।

একটি বিষয় বলে রাখি, আপনারা যারা পঙ্খীরাজের পিঠে চড়ে উড়বার চিন্তা করছেন তাঁরা অন্যভাবে ভাবলেই ভালো করবেন। পিঠে চড়ে উড়ে বেড়াবার জন্য ঘোড়ার চাইতে ঈগল ভালো। এদের সেই সামর্থ রয়েছে। প্রমাণ আকারের মানুষ বয়ে বেড়াবার জন্য "খুবই সম্ভব' খানিকটা গবেষণা করলেই হবে। সেই গবেষণায় বিশেষ ঝক্কি নেই। দ্রুত সফলতা আসবে সেটাও প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায়। সমস্যা হবে ঈগলের মানসিকতায়। আপনাকে উড়িয়ে বেড়াবার বদলে সে যে আপনাকে দিয়ে লাঞ্চ করে ফেলতে চাইবেনা সেই নিশ্চয়তা অন্তত আমি দিতে পারছি না।

ভূমিকা:
আমি সম্ভবত অদ্ভুত চিন্তা করি। আমার সকল ভাবনা লিখে ফেললে সমাজে বাস করা মুস্কিল হবে। খুব শঙ্কা নিয়ে প্রথমবার মহাসরলীকরণ করে খানিকটা আজাইরা ভাবনা লিখে ফেললাম। পঙ্খীরাজ প্রসঙ্গে একটা ধারনা দেয়ার চেষ্টা করলাম কেবল। এটা পড়ে  আপনাের কীরকম হাসি পাবে বুঝতে পারছিনা। যাঁরা জীববিজ্ঞান পড়েছেন, তাঁরা যদি সত্যি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবণার হিসেব করে মন্তব্য করেন তো সেটা নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগবে। শিখতে ভালো লাগবে। কল্পনার কোথায় কোথায় বদলে নিতে হবে সেটা জানতে ভালো লাগবে। কিন্তু কল্পনা থামাতে ভালো লাগবে না। সুতরাং যাদের আমার কল্পনায় আপত্তি রয়েছে তারা হেফাজতে কল্পনায় যোগ দিন।

এবং শুভ জন্মদিন মুর্শেদ ভাই। আপনি যে কীরকম পঙ্খীরাজের মতো অসম্ভবভাবে সচলায়তনকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তা নিতান্ত কম লোকই বুঝতে পারে। কখনো সত্যি সত্যি পঙ্খীরাজ বানালে আপনাকে একজোড়া দেবো। আপাতত ক্লোন করা কিছু ব্যাকটেরিয়া আর ছত্রাক রয়েছে। নাশতায় মিথাইলথায়োএডিনোসিন ফসফোরাইলেজ খেতে চাইলে দুচারটে স্ট্রেইন নিতে পারেন।

সচলায়তনে প্রকাশিত

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: