শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৩

কে বলেছে ধুমপান ক্ষতিকর?!

আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন ধুমপানে ক্যান্সার হয়? আরো এটাসেটা কী কী জানি হয়! ডাঁহা মিথ্যে কথা। কিচ্ছু হয়না। একেবারেই কিছু না! এই লেখাটিতে সেই বিষয়ে বলছি। মহাপণ্ডিত গবেষকরা যে তামাককে ক্যান্সারের কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তার পেছনে বিরাট রাজনীতি আছে। মূল বিষয়টা অন্যরকম। যুগ বদলেছে, এখন আর তেলমশলা গুলিয়ে খাইয়ে দিলেই কি আর মানুষ ভুল বুঝে বসে থাকে? থাকেনা। সত্য সবার কাছে পৌঁছবেই। আপনার কাছেও পৌঁছবে। কিন্তু সত্য পৌঁছনোর আগে তামাকের প্রাথমিক এটাসেটা সম্পর্কে একটুখানি বলে নেই।


কথাগুলো তামাক নিয়ে নয়, সিগারেট নিয়ে বলছি। সিগারেট আর তামাকের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, তামাক খাওয়ার নিয়মে। তামাক পুড়িয়ে ধোঁয়া ফুসফুসে নিলেই সে সিগারেট খাওয়া। আর এমনিতে তামাক চিবিয়ে অথবা ভাত দিয়ে খেলে সেসব অন্যরকমের তামাক সেবন। আজকের কথাবার্তা সিগারেট নিয়ে। একটু এদিকসেদিক করে নিয়ে অবশ্য কথাগুলো অন্যউপায়ে তামাক সেবনের বেলাতেও সত্যি।

মানুষে সিগারেট কেন খায়?

শান্তির জন্য খায়। এবং অশান্তি থেকে পালাবার জন্য খায়। এই দুটো জিনিসই মানুষকে দেয় নিকোটিন। যারা নিকোটিনে আসক্ত নন, তাঁরা নিকোটিনে শান্তি মিলবে সেই আশায় সিগারেট খান। আর যাঁরা নিকোটিনে আসক্ত তাঁরা সিগারেট খান অশান্তি থেকে বাঁচার জন্য। মস্তিস্কে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিকোটিন না থাকলে তাঁদের অশান্তি লাগে। সেই অশান্তি নাছোড়বান্দা অশান্তি। অদৃশ্য-নীরব সেই অশান্তির মতো অশান্তি আর কোনো মাদকে হয়না।

বলছিলাম, মস্তিস্কে নিকোটিনের মাত্রা কমে গেলেই অশান্তির শুরু, নিকোটিনের মাত্রা কমবে কেনো? একবারে একবোচকা নিকোটিন মস্তিস্কে ভরে দিলেই হয়। তারপর নিশ্চিন্ত। তাই না?

উহুঁ, নিশ্চিন্ত হওয়া যায়না। মানুষের শরীরের নানা কলকব্জা নিকোটিনকে ভালোবাসেনা। রক্তে থাকা আস্ত নিকোটিন ধরে ধরে শরীর থেকে বিদেয় করে কিডনী, যকৃতের এটাসেটা এনজাইম মিলে বেশিরভাগ নিকোটিন ওলটপালট করে কোটিনিন বানিয়ে ফেলে। খানিক নিকোটিন ফুসফুসে গিয়ে অক্সিজেনের সঙ্গে ঘোঁট পাকিয়ে নিকোটিন অক্সাইড হয়ে যায়। সবমিলিয়ে নিকোটিনের শান্তি নেই। শরীর থেকে তাকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করবার তালে থাকে শরীরের এটাসেটা কলকব্জা।

নিকোটিন শরীরে থাকলে কী হতো? মানে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ কী হয়?

হয় অনেক কিছু। আমাদের মতো যারা সাতেপাঁচে নেই তাদের অল্পস্বল্প জানলেও চলে, তাই আমরা অল্পস্বল্প জানবো। নিকোটিন ফুসফুসে পৌঁছলে দুম করে রক্তে পৌঁছে যেতে পারে। সবাই জানে ফুসফুসের অন্দরমহলে রক্তের সঙ্গে বাতাসের দেখায় হয়। ধুমপান করে সেই বাতাসের সঙ্গে ধুমপায়ীরা নিকোটিন মিশিয়ে দেন। বাতাসের মতো করে নিকোটিনও তখন একমুহূর্তে রক্তে চলে যেতে পারে। রক্তে গেলেই নিকোটিন মস্তিস্ক আর অন্যসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যাওয়ার অনুমতি পায়। কিন্তু কেবল ফুসফুস থেকে যে নিকোটিনকে শরীরে প্রবেশ করতেহবে তেমন নয়। খানিক অক্সিজেন, নাইট্রেজোন, কার্বনে বানানো নিকোটিন মানুষের ত্বক আর মিউকাস মেমব্রেন ভেদ করে প্রবেশ করতে পারে। তারমানে, নিকোটিন গ্রহনের জন্য যে আপনাকে সিগারেট খেতে হবে তেমন নয়। সিগারেটের ধোঁয়া অথবা ধুমপায়ীর কাছাকাছি থাকলেও হবে। ধুমপায়ীর জামাকাপড়-ঘরবাড়ির সংস্পর্শে থাকলেও হালকাপাতলা নিকোটিন আপনি পাবেন। যিনি ধুমপান করেন তাঁর পরিবার পরিজনকে নিকোটিন অত্যন্ত ভালোবাসে।

যা বলছিলাম, শরীরে প্রবেশ করে নিকোটিন সবার আগে হরমোন গ্রন্থিকে ফুসলিয়ে শরীরে একগাদা এড্রেনালিন হরমোন ছেড়ে দিতে বলে। তাতে শরীরে একটা টানটান অনুভূতি হয়। এড্রেনালিন একাধিক অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। এসব অনুভূতির সঙ্গে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর হওয়া আর রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

এড্রেনালিনের জন্যে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। গ্লুকোজ হচ্ছে শরীরের জ্বালানী। রক্তে জ্বালানি বেড়ে যাওয়া মানে বেশি শক্তি খরচের জন্য শরীর প্রস্তুত হয়ে যাওয়া। তারউপর যে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে ঠিক করবে, নিকোটিন গিয়ে সেই ইনসুলিনের কাজকর্মেও বাগড়া দিত পারে। তারমানে রক্তে তো গ্লুকোজ বাড়লই আর তা নিয়ন্ত্রণেও তৈরি হলো বাধা।

নিকোটিনের কাজকর্ম এখানেই শেষ না। শরীরের সব কার্জকর্ম নানান সংকেতের মাধ্যমে হয়, সে তো আপনারা জানেনই। তেঁতুল দেখলে আপনার জিভে জল আসে কেন? তেঁতুল দর্শনের অনুভূতি প্রক্রিয়াজাত করে আপনার মস্তিস্ক জিহ্বার লালাগ্রন্থিগুলোকে খুঁচিয়ে রাগিয়ে দেয় বলেই জিভে জল আসে। কিন্তু মস্তিস্ক কি আর হাতে ধরে লালাগ্রন্থিকে খোঁচাতে পারে? পারে না। খোঁচাখুঁচির জন্য মস্তিস্কের রয়েছে খোঁচানো রাসায়নিক। খোঁচাখুঁচি করার মস্তিস্কের এসব রাসায়নিককে বলে নিউরোট্রান্সমিটার। নিকোটিন মস্তিস্কে অ্যাসিটাইলকোলিন নামের এক নিউরোট্রান্সমিটার ছাড়তে অনুপ্রাণিত করে। খটোমট নামের এই কচুটার কাজ হচ্ছে আপনার মস্তিস্ক এবং শরীরকে উত্তেজিত করা। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য সতর্ক করা। পরীক্ষার আগের মুহূর্তে বইয়ের পাতা ওল্টানোর যে সতর্ক ব্যস্ততা সেইরকমের সতর্কতা। পাগলা কুকুরে তাড়া করলে দৌড়াবার যে উত্তেজনা, সেইরকমের উত্তেজনা।

ধুমপায়ীরা এজন্য সিগারেট খেলে সতেজ এবং "এনার্জেটিক' বোধ করেন। জটিল চিন্তায় মনোনিবেশ করা সহজ হয়ে যায় সিগারেটে একটা টান দিলেই। এইসব অনুভূতি যে ভালো লাগার অনুভূতি তাতে সন্দেহ নেই। সাধারণত ধুমপায়ীরা সিগারেট খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভালো লাগার অনুভূতিকে মিলিয়ে নেন। একটা সময় পর, তাঁরা অচেতন ভাবেই নিকোটিন গ্রহন করে ভালো থাকতে শুরু করেন। সিগারেট নিয়ে ম্যাচ হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়েই মনে হতে থাকে, বেশ ভালো লাগছে। যদিও তখনো নিকোটিন মস্তিস্কে প্রবেশ করেনি। কিন্তু ধুমপায়ীর মস্তিস্ক হচ্ছে এমন। ভালো থাকার অনুভূতির সঙ্গে সিগারেটকে সে মিলিয়ে নিয়েছে। মস্তিস্কে নিকোটিনের পরিমাণ কম হলেই তখন তার "খারাপ থাকা'র অনুভূতি শুরু হয়।

নিকোটিনের সঙ্গে ভালো থাকার অনুভূতির সংযোগটাকে শক্ত করে ডোপামিন নামের আরেক নিউরোট্রান্সমিটার। এই ব্যাটা হচ্ছে সুখানুভূতির যোগানদার। ডোপামিনের বাংলা নাম হচ্ছে লোভ। যেখানেই লোভ সেখানেই ডোপামিন। বায়োলজিস্টরা এইখানে আমার কথা খানিকটা তেরছা হয়েছে বলে কাঁইকুঁই করতে পারেন। কিন্তু আমরা তো কোনো সাতেপাঁচে নেই, তাই আমাদের খানিকটা তেরছা করে বিজ্ঞান বুঝলেই চলে।

যা বলছিলাম, ডালপালা ছেঁটে ফেলে নিকোটিনের মূল বিষয়টা হচ্ছে এই। ভালো থাকার লোভ আর খারাপ থাকার ভয়। এই দিয়ে নিকোটিন ধুমপায়ীদের বশ করে রাখে। এই প্রসঙ্গে আরেকটু বলব, কিন্তু সে পরে। এইবার যেসব মাথামোটা বৈজ্ঞানিকেরা সিগারেট নিয়ে দুষ্টুদুষ্টু কথা বলে তাদেরকে একহাত নেয়া যাক। প্রথমে দেখি নিকোটিন এবং সিগারেটের প্রসঙ্গে অভিযোগ কী কী রয়েছে। তারপর আমরা এইসব অভিযোগকে বৈজ্ঞানিকভাবে ডাঁহা মিথ্যা প্রমাণ করব!

সিগারেটের দ্বিতীয় খারাপ দিকটি হচ্ছে, নিকোটিন নিজে একটি বিষ। ঘটনা সত্য। পোকামাকড় মারতে নিকোটিনের ব্যবহার আছে। মানুষের জন্যেও এটি বিষ। এইখানে কোনো তেরছা কিছু নেই। সহজ সরল সত্য। তাহলে নিকোটিন নিয়ে ধুমপায়ীরা মরে যায়না কেনো? অথবা ধুমপায়ীদের নিঃশ্বাস, ত্বক, জামাকাপড়, পরিবেশ, ঘরবাড়ি থেকে তাদের স্বজনরা যে নিকোটিন শরীরে গ্রহন করেন তারা মরে যায়না কেনো? কারণ হচ্ছে, মরে যাওয়ার মত যথেষ্ট পরিমাণ নিকোটিন কেউ একবারে গ্রহণ করেনা। মাত্রায় কম বলে নিকোটিনে দুম করে মানুষ মরেনা। মরে আস্তে আস্তে। ধুমপায়ীরা প্রতিবার ধুমপানের সময়ই আশেপাশের সকলকে নিয়ে একটুখানি মরে যায়।

ধুমপানের প্রথম খারাপ দিকটি সম্পর্কে বলি এবার। সবার জানা, সবচে প্রচারিত, সবচে চিল্লায়িত প্রসঙ্গ। ফুসফুসে ক্যান্সার। ধুমপান করলে ফুসফুসে ক্যান্সার হয়। নিশ্চিত হয়? হিসাবটা এরকম, ১০ জন ফুসফুসে ক্যান্সার রোগীর মধ্যে ৯ জনেরই হয় ধুমপানের কারণে।কিন্তু কেনো? ধুমপান করলে ফুসফুসে ক্যান্সার কেনো হবে?

এই বিষয়টা খুব সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। সিগারেটের মূল আশক্তি নিকোটিনে। কিন্তু নিকোটিন নেয়ার জন্য আমরা তামাক পুড়িয়ে ধোঁয়া গ্রহন করি ফুসফুসে। সিগারেটের ধোঁয়াতে থাকে অন্তত ৭ হাজার (সাত হাজার) [ঠিকই বলছি, অন্তত ৭ হাজার] রকমের রাসায়নিক। মজার বিষয় হচ্ছে এই সাত হাজার রাসায়নিকের বেশিরভাগই মানুষের শরীরে (কোষে) কীরকমের প্রভাব ফেলতে পারে তা আমাদের জানা নেই। সুনির্দিষ্ট গবেষণা করে সেসব বের করার সুযোগ খুবই কম। কিন্তু সব যে আমাদের অজানা তা নয়। আমরা জানি এই সাত হাজার রাসায়নিকের মধ্যে অন্ততপক্ষে ৬০ টি হচ্ছে কারসিনোজেন। এর বেশিও হতে পারে, আমাদের জানা নেই। কিন্তু অন্তত ৬০টি কারসিনোজেন যে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

কারসিনোজেন হচ্ছে সেই জিনিস যা ক্যান্সারের কারণ। ক্যান্সার মানে তো আমরা জানিই। কোষের বৃদ্ধিতে যখন আর নিয়ন্ত্রণ থাকেনা তখন সেটা ক্যান্সার কোষ। কোষের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হওয়ার কারণের হিসেব এই লেখাতে আমরা না করি। একটা গাড়িকে যতো উপায়ে নষ্ট করা যায় তারচে বেশি উপায়ে কোষের চরিত্র নষ্ট করা যায়। কারসিনোজেন হচ্ছে কোষের চরিত্র নষ্ট করার উপাদান। একজন ধুমপায়ী যখন ফুসফুসে তামাকের ধোঁয়া গ্রহন করেন তখন অন্তত ৬০ টি কারসিনোজেন তাঁর ফুসফুসের অগণিত কোষের সংস্পর্শে আসে। কেউ যদি একশোটা ঢিল নিয়ে একটি দেয়ালের গায়ে ছুঁড়ে মারে তাহলে সর্বোচ্চ সেই দেয়ালের একশোটা ইট ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। কিন্তু কেউ যদি ঘরের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে তাহলে সেই ধোঁয়া ওই ঘরের দেয়ালের কোন ইটটির সংস্পর্শে আসবে না?

প্রতিটান সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে অন্তত ৬০টি রাসায়নিক গিয়ে ফুসফুসের কোষগুলোকে ক্যান্সার কোষ বানাতে চেষ্টা করে। এবং তারা নিয়মিতই সফল হয়। জ্বি হ্যাঁ, ঘটনা সত্যি। কিন্তু মানুষের শরীরে রয়েছে শক্ত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা। শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষেরা যে কেবল বহিরাগত রোগজীবাণু মেরে নিকেশ করে তা নয়। তারা শরীরের বিগড়ে যাওয়া কোষগুলোকেও মেরে শেষ করে। ধুমপায়ীর শরীরে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া ক্যান্সার কোষেরা সেজন্য বাঁচতে পারেনা। তাদেরকে মেরে ফেলে শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষেরা। (আয়রনি হচ্ছে, ধুমপানের ফলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাও দূর্বল হয়ে যায়।) কিন্তু হারজিতের এই খেলা অনন্তকাল চলেনা। সেরকম যদি হতো তাহলে এই পৃথিবীর মানুষেদের কখনো ক্যান্সার হতনা। সব ক্যান্সার কোষকে শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষেরা মারতে পারেনা। কেউ কেউ টিকে যায়। আর অনন্তকাল ধরে বাড়তে থাকে। তখন হয় সত্যিকারের ক্যান্সার। প্রতিদিন একঘন্টা পরপর আপনাকে একলক্ষ গুলি করা হলে আপনি কতটা গুলি এড়িয়ে যেতে পারবেন? কতকাল ধরে কতটাগুলি এড়িয়ে যেতে পারবেন? সেজন্য ধুমপান করলে যে ফুসফুসে ক্যান্সার হবে সেটা অবাস্তব কিছু নয়, ক্যান্সার না হলেই বরং সেটা অবাক করার মতো বিষয়!

আমেরিকায় প্রতি ১০টি ক্যান্সারের ৩টির কারণ ধুমপান। হয়তো আরো বেশি। আমাদের জানা নেই। সারাপৃথিবীতে এই সংখ্যা আরো বেশি। তৃতীয়বিশ্বের মানুষেরা ভোগেন সবচে বেশি ক্যান্সার ঝুঁকিতে। কিন্তু ক্যান্সার প্রসঙ্গই শেষ নয়। ক্যান্সার প্রসঙ্গ এমনকি শুরুও নয়। ধুমপানের ফলে আর যা যা হতে পারে তাতে ক্যান্সার না হলেও কিছু এসেযেত না!

৭০০০ রাসায়নিকের ৬০টির হিসেব করছিলাম আমরা। যে ৬০টা সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত যে সেগুলো ক্যান্সারের কারণ। বাকি ৬ হাজার ৯শ ৪০টি রাসায়নিক কী করে শরীরে গিয়ে?

আমরা তো সব জানিনা। কিছু কিছু জানি। সায়ানাইড, এমোনিয়া, এসিটাইলিন, মিথানল, বেনজিন, ফরমালডিহাইড এইসব রাসায়নিকগুলোর নাম তো আমরা সবাই জানি তাইনা? এইসব নিয়ে অনেক বর্ণনা করার সময় নেই। আমরা আমাদের মূল প্রসঙ্গে আসব। এইখানে কেবল জানিয়ে রাখি যে, এইসব রাসায়নিক যেকোন একটি দিয়ে মানুষ মেরে ফেলা যায়। অন্তত সায়ানাইড বিষটি তো সাহিত্য-নাটক-সিনেমার তারকা!

ধুমপানের কারণে কী কী হতে পারে সেসব তো আমরা জানিই। আমি দুইলাইনে আমার বলব:

প্রথম লাইন: ধুমপানের কারণে অন্তত ১০ রকমের ক্যান্সার হয়।
দ্বিতীয় লাইন: ধুমপানের কারণে আরো অন্তত ১০ রকমের রোগ হয় যা ক্যান্সারের মত মারাত্মক।
বোনাস লাইন: এইগুলো সম্ভাবণার কথা নয়, কিছু না কিছু হবেই।

সমস্যা হচ্ছে, কেউ ধুমপানের ফলে ক্ষতিকার কিছু চোখের সামনে দুম করে ঘটতে দেখেন না। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য মেনে না নিলেই সে মিথ্যে হয়ে যায়না। ধুমপায়ীরা প্রত্যেকেই তাঁদের জীবনে সরাসরি ধুমপানের কুফল ভোগ করেন। সেই কুফল খুব সহজ এবং স্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বেশিরভাগেই জানেন না যে তাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলি ধুমপানের ফলে হচ্ছে। রসায়নের নিয়মগুলো খুব সহজ এবং বাস্তব। একটি কোষের উপর একটি রাসায়নিক প্রয়োগ করলেই সেই কোষটি ওই রসায়নিকের প্রেক্ষিতে আচরণ করে। একটি কোষের উপর ৭ হাজার রাসায়নিক প্রয়োগ করলে কী হবে?

এই মুহুর্তে ধুমপায়ীদের যাঁরা এই লেখাটি পড়ছেন তারা অনেকেই একটা বিশেষ অনুভূতিতে আছেন। একটা অস্থিরতার অনুভূতি, অস্বস্তির অনুভূতি। শেষ একটা সিগারেট না খেতে পারার আতঙ্কের অনুভূতি। সিগারেট নিয়ে এতগুলো কথা পড়ার ফলে, এতবার সিগারেট শব্দটা পড়ার ফলে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত অনুভূতি। ডোপামিনের অভাবের অনুভূতি। খানিকটা বেশি ডোপামিন না থাকার অনুভূতি! মজার বিষয় হচ্ছে এই সকল সমস্যাই আর মাত্র একটি সিগারেট খেয়ে উপশম হয়ে যাবে। সিগারেটের প্রথম কয়েকটি টান দেয়ার পরেই সব অস্বস্তির শেষ হয়ে যাবে। তখন মনে হবে, সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। ছেড়ে দেয়াই ভালো। তখন আপনি জানবেন এই সিগারেটটিই আপনার শেষ সিগারেট। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শেষ সিগারেটটিতে। শেষ সিগারেটটি না খেয়ে থাকা অসম্ভব একটি কাজ।

বৈজ্ঞানিকভাবে, মানুষের মস্তিস্কের পুরষ্কার পাওয়ার অনুভূতি তৈরি করতে পারে এমন সকল কিছুই আসক্তি। পুরষ্কার পাওয়ার অনুভূতি তৈরি করে ডোপামিন। ডোপামিন আপনার মধ্যে সেই অনুভূতি তৈরি করে যা বারবার পাওয়ার জন্য আপনার আকাঙ্খা তৈরি হবে। হতেই হবে। মানুষ হিসেবের বাইরের কোনো প্রাণি নয়। মানুষের এমনকি প্রেম-ভালোবাসা-স্নেহ-মমতার অলৌকিক বাংলসিনেমা সব অনুভূতিরও সহজ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।

নটে গাছটি মুড়োল।

[সূচনা: এই লেখাটি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে লেখা নয়। ধুমপায়ীদেরকে আমি কখনোই ধুমপান বন্ধ করতে বলিনা। পৃথিবীর মানুষ ধুমপান করবে এবং সেই অসাধারণ অনুভূতির দেনা শোধ করবে তাদের জীবদ্দশাতেই। এই হিসেব অঙ্কের মত সহজ। আমি এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত নই। আমার শুধু ভালো লাগেনা ধুমপায়ীদের পরিজনের কথা ভেবে। ধুমপায়ীদের আশেপাশের মানুষেরাও একইরকমের ক্ষতির মুখোমুখি হন। অথচ তাদের কোনো দোষ নেই।

আমি ধুমপান ছেড়েছি ২ বছরেরও বেশি আগে। আমি এখনো নিশ্চিত নই ডোপামিনের আসক্তি আমি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি কিনা। আমার এখনো কাউকে খুব দারুণ ভাঙ্গিতে সিগারেটে টান দিতে দেখলে মনে হয় একটা টান দিলে কী না জানি অলৌকিক ভালোলাগার অনুভূতি হতো! দুইবছর পর থেকে খানিকটা আসক্তি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি বলে মনে হচ্ছে বলেই এই লেখাটি লিখলাম। আত্মবিশ্বাসটা আজাইরা কিনা জানিনা কিন্তু সেটি তৈরি না হলে এই লেখাটি লিখতাম না হয়ত। এমনিতে এই লেখাটি আরো দীর্ঘদিন আগে লিখতে ইচ্ছে হয়েছিল।

এবং যারা ধুমপানের ফলে কোন ক্ষতি হয়না কীভাবে' সেই অলৌকিক সত্য জানতে অপেক্ষা করে আছেন তাদেরকে জানিয়ে রাখি, ওই বিশেষ অংশগুলো আমি মিথ্যে বলেছিলাম।]

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: