শুক্রবার, ২১ মার্চ, ২০১৪

ভালোবাসার গল্প

এটা অতি পুরোন এক লেখা। এবং ভয়াবহভাবে আবেগপ্রসূত! আবেগে যাঁদের আপত্তি আছে তাঁদের ভেতরে প্রবেশ না করাই ভালো। বস্তুত এই লেখাটি কখনোই প্রকাশিত হবার সম্ভাবণা ছিলনা। আজকে হঠাৎ সামনে পড়ায় কী ভেবে প্রকাশ করে দিলাম!
অনেকদিন কিছু লিখিনা। মাঝে মঝে লিখতে ইচ্ছে করে।


দেশ ছেড়ে আসলে বোধহয় মানুষের শরীরে প্রোল্যাকটিনের উৎপাদন বেড়ে যায়! কারণে অকারণে কণ্ঠ বন্ধ হয়ে আসে। প্রথম যখন এসেছি, তখন থাকি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বড় একটা স্টুডিও ফ্ল্যাটে। বারান্দা দিয়ে পাহাড়ের সারি দেখা যায়। অক্টোবরের ঠাণ্ডা পাত্তা দেয়ার মতো কিছু নয়। কিন্তু তখনো আমার চামড়ার বাঙালিপনা যায়নি। শরতের বাতাসেই হুহু করে কাঁপতে থাকি। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে বারান্দায় যাই না। দূর্ভাগ্যবশত, খানিক পরপরই আমার নিতান্ত প্রয়োজন হয়। আমি বারান্দায় গিয়ে পাহাড়মুখি বাতাসে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকি। মন্ত্রের মতো জপতে থাকি, হরমোন হরমোন হরমোন হরমোন...!

বারান্দায় যাওয়ার প্রয়োজন ওই শ্বাস নেয়ার। কারণে অকারণে কণ্ঠ ভার হয়ে আসে। চোখ ভরে ওঠে। নিজেকে আস্কারা দেই না। দৌড়ে বারান্দা চলে যাই। হরমোন হরমোন বলে নিজেকে বুঝ দেই। নিজের কাজে কর্মে হেসে ফেলি কখনো কখনো। সৌভাগ্যবশত, আমার সেই জীবনের কোনো দর্শক নেই।

বিরক্তিকর মানবিক যন্ত্রণা থেকে দূরে থাকার নানা উপায় আছে আমার। সবারই আছে বলে মনে হয়। সবচে সহজ উপায় হচ্ছে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। দেশে ছাড়ার বেশ আগে থেকেই আমি সেই কাজে পটু। রাজ্যের বই পড়ে ফেলছি, দুনিয়া খাদ্য-অখাদ্য সিনেমা দেখে ফেলছি। কেবল গান শুনছি না। গান শুনলে নানা চিন্তা মাথায় আসে। চিন্তা করতে চাই না। পালাতে চাই।

কৌতুহল বশত আবিষ্কার করেছিলাম, বাংলায় বিজ্ঞানের বই আর না থাকুক, মনোস্তত্ত্বের বই আছে শয়ে শয়ে। সবগুলোর কথা জানিনা, কিন্তু বেশিরভাগই নিতান্ত অখাদ্য। জ্যোতিষবিজ্ঞান যেমন হাস্যকর। বাংলাদেশের জনপ্রিয় মনোস্তত্ত্বের বই তেমনি বিরক্তিকর! সেবার এক চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানের সহকারি অধ্যাপককে জিজ্ঞেস করলাম, ভাবনা থামানোর কোনো ওষুধ আছে? ধরুন কোনো একটি বিষয় আমি ভাবতে চাইনা, কোনো একটি ওষুধ খেয়ে কি সে সম্ভব? ডাক্তার বললেন, ওরকম তো সম্ভব নয়, কিন্তু ভাবতে না চাইলে তাতে সহায়তা করার মতো ওষুধ আছে। গুপ্তধন পাওয়ার মতো অনুভূতি হলো আমার। ডাক্তারকে পটিয়ে সেই ওষুধ চেখে দেখলাম। সেই ঘটনাকে জীবনে করা নির্বুদ্ধিতার তালিকায় প্রথম সারিতে রেখেছি। সেই অনুভূতিকে জীবনের সবচে যন্ত্রণার অনুভূতির তালিকায় রেখেছি। একইসঙ্গে মনোচিকিৎসকের উপর শ্রদ্ধা হারিয়েছি! এতোকথা লেখার মানে হচ্ছে একটা উপলব্ধি। মানবিক যন্ত্রণার ওষুধও মানবিক। ওর কোনো শর্টকাট নেই। সেই কথা জেনেছি দীর্ঘদিন হয়।

মানুষ হয়ে জন্মেছি। এবং হরমোন গ্রন্থিগুলোতে বোধকরি কোথাও কোনো সমস্যা নেই। সেইজন্য নানা কিম্ভুত অনুভূতি আমার উপর ভাগ বসাতে চায়। আমি ছলে-বলে-কৌশলে পালাতে চেষ্টা করি। হরমোন হরমোন জপমালা হচ্ছে সেই কৌশলের অংশ। দেশ থেকে এসে যখন সব ফাঁকা লাগতো। আর কারণে অকারণে চোখ টইটম্বুর হয়ে যেতে চাইতো তখন নানা বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে নিজের গাধামি নিজেকে বোঝাতে হতো।
কান্না আসছে কেন?
-বিবর্তনের ব্যাখ্যা বলে...
- আরে ধুর অতো বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা করবার টাইম নাই। শরীরে প্রোল্যাকটিনের দরকার। প্রোল্যাকটিন হচ্ছে হরমোন। সদ্য শিশুর জন্ম দেয়া মায়েদের শরীরে এই হরমোন একেবারে বাড়াবাড়ি মাত্রায় থাকে। মায়েদের মনে অলৌকিক শান্তির অনুভূতি তৈরি করে এই হরমোন। কান্নাকাটি করলে একটা শান্তি শান্তি ভাব আসার একটা কারণও এই হরমোন। স্তন্যদাত্রী মায়েদেরযে শান্তির অনুভূতি সে-ও এই হরমোনে তৈরি করে। হরমোন হরমোন হরমোন। ওই হরমোন খানিকটা হলেই শান্তি মিলবে!

দেশে ছেড়ে এসে, জার্মানির এক গাঁয়ে বসে আমি হরমোন আর মানুষের শরীরতন্ত্রের নানা জটিল জ্ঞান আহরণ করি। খানিক হরমোনে মিলে যন্ত্রণা পাকায়। শরীরে খানিকটা হরমোন হলে ঝামেলা শেষ হয়। ম্যাঙ্গানিজের পরিমাণও বোধহয় বেড়ে গেছে রক্তে! কমানো দরকার!

এইসব নানাবিধ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আহরণ করে লাভ হয় যে, চিন্তা ভাবনা "লাইনে' চলে আসে। বিরক্তিকর আবেগ কমে যায়। এবং নিজের কাজকর্মে হাসি আসে। লাফানো থামানোর সহজ উপায় হচ্ছে কেনো লাফাচ্ছি তা ভেবে দেখা। সেই ভাবনায় আর কোনো উপকার না হোক অন্তত লাফানোতে ছন্দপতন হয়।

সেই পরবাসে আমাকে আমাকে সকাল বিকাল "হরমোন জ্ঞান' ব্যবহার করতে হয়। ক্লাস এবং ল্যাবের বাইরের বাকিটা সময় আমি তখন মনিটরে চোখ গেঁথে বসে থাকি। রাজ্যের সিনেমা, ডকুমেন্টারি, ধারাবাহিক দেখে লাশ করে ফেলি। বাংলাদেশের কিছু দেখলেই চোখ ছলছল করে ওঠে। হরমোন হরমোন বলে জপ করতে হয়। তারপর নিজের কাজকর্মে হেসে ফেলতে হয়।

ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগে পর্যটন কর্পোরেশন "বিউটিফুল বাংলাদেশ' নামে বিজ্ঞাপন বানিয়েছে। সেই বিজ্ঞাপন দেখে ধ্বক কর উঠলো বুক। আমি দৌড়ে বারান্দায় চলে গেলাম। হা করে পাহাড়ের বাতাস গিলতে লাগলাম!

শাহবাগে মানুষের ভিড়। বন্ধুরা সেখানে, স্বজনেরা সেখানে। আমার পক্ষে এক বছরের চন্দ্রা'কে পাঠিয়েছি। ওর মা সেই ছবি তুলে পাঠিয়েছে আমাকে। দেখে আমার চোখ ছলছল করে উঠলো! আমি হরমোনের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেকে বাঁচালাম!

মুক্তিযোদ্ধা বাবা রাতভর ছেলের জন্য রাজাকার-বিরোধী পোস্টার এঁকেছেন। সেই পোস্টার নিয়ে ছেলে গিয়ে একা একা দাঁড়িয়েছে অচেনা বাঙালিশূন্য শহরে। সেই ছবি দেখে আমার চোখ ছলছল করে উঠলো! দুনিয়ার এশহরে একজন, ও শহরে দু'জন, সে শহরে কয়েকজন বাঙালি মিলে রাজাকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে একসঙ্গে। সেই ছবি দেখে কনকনে ঠান্ডায় জানালা খুলে আমাকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হলো।

চন্দ্রাকে ফোন করলে সে তার নিজের ভাষায় আমার সঙ্গে নানা গল্প জুড়ে দেয়। আমি বলি, "একটু বাংলা বলবি? তোর ভাষা বুঝবার যোগ্যতা তো আমার নেই'! চন্দ্রা পাত্তা দেয় না। তার কথা শেষ হলে পরে ফোন দেয় ওর মায়ের কাছে। আমি কাজের কথা বলে দ্রুত ফোন রাখি। নেট ঘেঁটে প্রোল্যাকটিনের কার্যপ্রাণালী বুঝতে চেষ্টা করি। হরমোনটাই সব যন্ত্রণার মূল!

কারণে অকারণে আমি আবিষ্কার করি আমি মানুষ হিসেবে দূর্বল। কখনো খুব রেগে গিয়ে যে প্রতিজ্ঞা করি, সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা হয়না! অনেক ভেবেচিন্তে যে হিসেব করি, সেই হিসেব মানা হয়না। আমি খুব দূর্বল মানুষ। আমাকে দিয়ে হয়নি, হবেনা। আমি নিজেকে শান্তনা দেই। নির্বুদ্ধিতা সব যুক্তিতেই নির্বুদ্ধিতা। আমি জানি। জেনেবুঝে নির্বোধের মতো আচরণ করি। নিজের অকৃতকার্যতায় হতবাক হয়ে যাই। তারপর স্থবির হয়ে বসে থাকি।

চারপাশে অমানুষের সারি দেখে দেখে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই। আমি কোনো আশা করিনা। আশা করার কিছু নেই। অনেক ভেবে চিন্তে হতাশার জন্য কোন হরমোনটা দায়ী সেটা খুঁজে দেখতে চেষ্টা করি। কোন হরমোনটা মানুষকে অমানুষ বানায়? অথবা ঠিক কোন হরমোনটা থাকলে মানুষ ঠিক মানুষ হয়ে ওঠে?

নিকট অতীতের বড় একটা সময় ধরে আমার কৌতুহলের কেন্দ্রে ছিলো কিছু লোক। এই লোকগুলো সর্বশক্তিমান। তারা যা ইচ্ছে করতে পারে। যেভাবে ইচ্ছে করতে পারে। দারুণ নৃশংসতাকে "প্রয়োজন' বলে ভুলতে পারে। হাতে রক্ত মেখে হাসতে পারে। তারা যা-ই করুক, সেটার জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তি বানিয়ে নিতে পারে! আমি খুব অবাক হয়ে এইসব লোকেদের কথা ভেবেছি দীর্ঘদিন হয়। এতো ক্ষমতা নিয়ে কেউ কীভাবে জন্মায়? এরা কী কখনো দুঃখী হয়? সত্যি সত্যি দুঃখী, যে দুঃখ কারো কাছে বিক্রী করে কোনো লাভ করার সম্ভাবণা নেই, যে দুঃখ ভাগ করে নেয়ার দারুণ কোনো ব্যবসায় হয়না, যে দুঃখ কেবল মানুষের একার, সেরকম দুঃখহয় এইসব লোকেদের? সবকিছু খুব সহজ ব্যবসা কীভাবে হয়ে ওঠে এই লোকগুলোর কাছে?

ছোট্ট জীবনে কী অসীম কৌতুহল নিয়েই না মানুষকে মরে যেতে হয়!

দীর্ঘদিন হয়ে গেল জীবনের বিস্তীর্ণ সমস্যা আমি হরমোনের ঘাড়ে চাপাই। সময়ের ঘাড়ে চাপাই। কারো না কারো ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পালানোর অভ্যাস রপ্ত করে ফেলেছি দীর্ঘদিন হয়। কেবল জীবনের বড় বড় নির্বুদ্ধিতাগুলোর দায় কারো উপর চাপাতে পারিনা। যখন খুব তীব্রভাবে জীবনের কোনো কোনো ঘটনাকে বদলে ফেলতে ইচ্ছে করে, যখন খুব দারুণভাবে বছর কয়েক আগে ফিরে গিয়ে নিজেকে বাস্তবতার খুব সহজ কথাগুলো শুনিয়ে আসতে ইচ্ছে করে তখন হরমোন জপমালা আমাকে উদ্ধার করতে পারেনা।

তখন আবিষ্কার করি কতো করুণভাবে হেরে গেছি! আহা কতো করুণভাবেই না মানুষকে পরাজিত হতে হয়!

সচলায়তনে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই: