শুক্রবার, ২ মে, ২০১৪

হেনরিয়েটার অমরত্বের গল্প

হেনরিয়েটা অসাধারণ কিছু করে বসে অমর হননি। ওনার কেবল একটা রোগ হয়েছিল। ক্যান্সার। জরায়ু মুখে। জরায়ুর মুখকে যদি একটা দেয়াল ঘড়ির সঙ্গে তুলনা করা যায় তাহলে হেনরিয়েটার প্রাথমিক টিউমারটি ছিল চারের কাঁটার কাছাকাছি।


১৯৫১ সাল। তখনকার আমেরিকান সমাজে বর্ণবাদ কতখানি কুৎসিত যে বর্ণনা করে বোঝানো দায়। তখন বেশিরভাগ হাসপাতালেই কালোদের চিকিৎসা করা হয়না। যে অল্পকিছু হাসপাতালে করা হয় সেখানে কালোদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে। সব সামাজিক সুবিধাই তখন কালোদের জন্য আলাদা এবং সীমিত। হেনরিয়েটা সেই সমাজের মেয়ে। কালো। ৭ম অথবা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা। ১৫ বছর বয়স থেকে স্বামীর সংসারে।

৫১'র প্রথম ভাগে আমরা যেই সময়ে ভাষার জন্য লড়ছি, ঠিক তার কিছুদিন আগে হেনরিয়েটা গিয়েছেন জন হপকিন্স হাসপাতালে। সেইখানে কালোদের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। এমনিতে কালো বলে হেনরিয়েটা মারাত্মক শারিরীক সমস্যাকেও পাত্তা না দিয়ে বাঁচতে শিখে নিয়েছেন। ২৯ বছর বয়সেই পাঁচসন্তানে মা। ছোটকাল থেকে বার বার গলার সংক্রমণ আর নাকের গঠনে ত্রুটির জন্য শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। অপারেশন করে সারানো যেত, সারাননি। অন্তত ৫ বছর দাঁতের যন্ত্রণায় ভুগেছেন, চিকিৎসা করাননি। শেষ দুটি সন্তানের জন্মের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে। ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন, হেনরিয়েটা এড়িয়ে গেছেন। উপসর্গহীন নিউরো-সিফিলিস রয়েছে, চিকিৎসা করাননি। কিছুদিন আগেও জরায়ু কোষের কার্যক্রমে অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে। ডাক্তাররের পরামর্শ মেনে ক্যান্সার অথবা সংক্রমণের পরীক্ষা করাননি। মাসখানেক আগেও গণরিয়া ধরা পড়েছে। চিকিৎসা করাননি।

এই হেনরিয়েটা শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের কাছে গেছেন। বলেছেন, তার জরায়ুতে "কিছু একটা' রয়েছে। জন হপকিন্সের ডাক্তার হাওয়ার্ড জোন্স পরীক্ষা করে দেখেছেন, সত্যি। হেনরিয়েটার জরায়ুর মুখে ছোট্ট শক্ত একটা চাকতির মতো অংশ। ডাক্তার হাওয়ার্ড কোষীয় পরীক্ষণের জন্য হেনরিয়েটার জরায়ুর অস্বাভাবিক অংশ থেকে একটুখানি কেটে নিয়ে তাকে বলেছেন বাড়িতে চলে যেতে।

তারপর হেনরিয়েটা আবার হাসপাতালে ফিরেছেন তিন মাস পর। সেই একই স্থানে পূর্ণ একটা টিউমার নিয়ে। এত দ্রুত কোষের বৃদ্ধি কেউ তখনো দেখেনি!

×××

সেই সময়ে জরায়ুর ক্যান্সারকে মূলত দুটি ভাগ করা হত। একটি হচ্ছে, যেই ক্যান্সার কেবল জরায়ুর উপরিভাগের কোষে ছড়ায়। আরেকটি যেটি কোষের স্তর ভেদ করে ছড়ায়। প্রথমটি, বেশিরভাগেরই ধারনা ছিল মারাত্মক নয়। দ্বিতীয়টি মারাত্মক। সেই সময়ের আমেরিকার সেরা জরায়ু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের অন্যতম টেলিন্ডে  (TeLinde) অবশ্য সেরকম ভাবতেন না। তিনি মনে করতেন, জরায়ুর উপরিভাগের ক্যান্সার কেবল প্রথম পর্যায়। পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে যেতে পারে কোষের বিভিন্ন স্তরে। হেনরিয়েটার যখন চিকিৎসা হচ্ছে তার কিছুদিন আগেই টেলিন্ডে একটি সেমিনারে তার ধারনা সম্পর্কে বলেছেন। বাকি বিশেষজ্ঞরা তার কথা পাত্তা দেননি। টেলিন্ডে ঠিক করেছেন, ভালোমত গবেষণা করে প্রমাণ করবেন যে জরায়ু কোষের উপরিভাগের ক্যান্সারই দীর্ঘমেয়াদে ছড়িয়ে যেতে পারে কোষের গভীরে!

হপকিন্সের টিস্যু কালচার (কৃত্রিম অবস্থায় কোষের চাষ) গবেষণার প্রধান জর্জ গাইকে টেলিন্ডে অনুরোধ করেছেন, যেন তিনি তার সংগৃহীত ক্যান্সার কোষ কালচার করে দেখেন। গাই এবং তার স্ত্রী প্রায় ৩০ বছর ধরে কোষ নিয়ে গবেষণা করছেন ততদিন। কৃত্রিম অবস্থায় মানব কোষকে বাঁচিয়ে রাখা তখন দারুণ কঠিন কাজ (কেবল প্রমাণিত হয়েছে যে ইঁদুরের কোষকে বাঁচিয়ে রেখে বিভাজিত করা যায়) । মানব কোষ বেশিরভাগই দ্রুত মরে যায়। যে অল্পকিছু বেঁচে থাকে তা-ও কেবল বেঁচেই থাকে। সংখ্যায় আর বাড়েনা। টেলিন্ডের আবেদন তাই গাই সাদরে গ্রহন করলেন।  আরো খানিকটা পরীক্ষণের সুযোগ তিনি ছাড়বেন কেন?

তখন কোষের চাষ করার অন্যতম বড় সমস্যা ছিল কোষের খাবারে। কোষ কী খায়? কী খেতে দিলে সে বিভাজিত হয়ে সংখ্যায় বাড়বে? সেই গবেষণা তখন ডাইনীর রন্ধনশালার মতো। মুরগীর রক্তরস, বাছুরের ভ্রুণের ভর্তা, নানারকম লবন, মানুষের গর্ভনালীর রক্ত সবকিছু দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে! কী খেলে কোষেরা সুস্থ থাকে? টুপটাপ মরে যায়না? তার উপর রয়েছে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। সেই সময়ের গবেষণাগার আজকের মতো নয়। সেই সময়ে ব্যাকটেরিয়া (এবং অন্যান্য জীবাণুর) সংক্রমণে কোষ অহরহ মরে ভুত হয়। (এমনকি এখনো কোষের চাষ করতে গেলে সংক্রমণের এই সমস্যাটি এড়িয়ে চলতে সতর্ক থাকতে হয় সবচে বেশি)!

হপকিন্সের গবেষক এবং চিকিৎসক হিসেবে টেলিন্ডে সকল জরায়ুর উপরিভাগের ক্যান্সারের কোষীয় নমুনা সংগ্রহ করে পাঠালেন গাইয়ের গবেষণাগারে। যেখানে সেই কোষেদের ক্যান্সার হয়ে ওঠার সক্ষমতা যাচাই করে দেখা হবে (কোষের নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধিই হচ্ছে ক্যান্সার)। হেনরিয়েটা জানেন না. তাঁর কোষ গবেষণাগারের টেস্টটিউবে গিয়েছে। তিনি জানেন না, তার কোষ কীরকম অদ্ভুত রকমের নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে। বস্তত. হেনরিয়েটার কোষের বৃদ্ধি যে কীরকম নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে, সে সম্পর্কে তখন সেই পৃথিবীর কারোরই কোন ধারনা নেই।

×××

হেনরিয়েটাকে যখন জানানো হয় তার কোষগুলি ক্যান্সার কোষ, তখনো তিনি কাউকে জানাননি। তিনি তখনো ভাবছেন, সেরে উঠবেন। এ আর এমন কী! চিকিৎসা নিলেই সেরে ওঠা যাবে। ডাক্তারেরা তাকে রেডিয়াম দিয়ে চিকিৎসা করছেন।

গতশতকের মাঝামাঝি রেডিয়ামকে অসম্ভব ক্ষমতাধর পদার্থ ভাবা হত। রেডিয়াম কোষকে মেরে ফেলে। ক্যান্সার কোষকেও। শল্য চিকিৎসার চাইতে তাই রেডিয়াম ভালো। তখন ঘড়ির ডায়ালে মানুষের হাতে হাতে রেডিয়াম। গ্যাস-বিদ্যুৎ-আলো সকলকিছুর বিকল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবণা দেখছে মানুষ রেডিয়ামে। রেডিয়ামের মহৌষধে হেনরিয়েটাও আস্থা রাখলেন। প্রথম চিকিৎসা নিয়ে ফিরে এলেন। বলে দেয়া হল, সমস্যা দেখা দিলে যেন পরের চিকিৎসার জন্য আড়াই সপ্তাহ পরে আবার হাসপাতালে আসেন।

হেনরিয়েটা বাড়িতে গেলেন। তাঁর কোষেরা হাসপাতালে রয়ে গেল। জর্জ গাইয়ের ২১ বছর বয়সী সহকর্মী মেরি তাদের মুরগীর ডিমের সাদা অংশে চাষ করবার চেষ্টা করছে। পরীক্ষণ টিউবের উপর লেখা: হেলা। হেনরিয়েটা ল্যাকস এর অদ্যক্ষর (Henrietta Lacks = HeLa)। প্রথম পরীক্ষণে হেলা কোষগুলো টিকেও গেছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন খানিকটা বৃদ্ধিও পেয়েছে। কিন্তু মেরি পাত্তা দেয়নি। অতীতেও এরকম হয়েছে হাজারবার । অনেক কোষই কয়েকদিন টিকে থেকে তারপর মরে যায়। গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই।

কিন্তু হেনরিয়েটার কোষগুলো অন্য সব কোষের মত নয়।
২৪ ঘন্টায় সেগুলো হলো দ্বিগুণ। পরের ২৪ ঘন্টায় আবার দ্বিগুণ। পরের ২৪ ঘন্টায় আবার। হেনরিয়েটার সাধারণ কোষের তুলনায় এই বৃদ্ধি অন্তত ২০ গুণ।

×××

কেউ যদি বলে মানব কোষ কৃত্রিমভাবে চাষ করায় কি লাভ হলো?
যিনি জীববিজ্ঞান আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা সম্পর্কে খুব ভালো ধারনা রাখেন না, তাঁকে বুঝিয়ে বলা মুস্কিল! উদাহরণ দিতে চেষ্টা করি। পৃথিবীর সবগুলো কম্পিউটার সরিয়ে দিলে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার যে ক্ষতি হবে. হেলা কোষ না থাকলে চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও সেই ক্ষতি হত! ধানগাছ বিলুপ্ত হয়ে গেলে আমাদের খাবারের যে সমস্যা হতো, হেলা কোষ না থাকলে অনেকটা সেরকমই হত! কোন মানুষ তার কোষ দিয়ে পৃথিবীর এতো উন্নতি করেনি, এত প্রাণ বাঁচায়নি। কখনো বাঁচাবেও না।

হেনরিয়েটা ল্যাকসের কোষের আগে মানুষের কোষ ল্যাবরেটরিতে কয়েকদিনের বেশি কৃত্রিমভাবে চাষ করা সম্ভব হয়নি। হেলা কোষ ছিল প্রথম কোষ যা গবেষণাগারের পরীক্ষণের পাত্রে বেঁচে থেকে বৃদ্ধি পায়।

১৯৫৫ সালে হেলা কোষ ক্লোন করা হয়। সেই প্রথম মানুষের কোষ ক্লোন করে মানুষ। তার একবছর আগেই অবশ্য এই কোষ উৎপাদন শুরু হয়েছে। পোলিওর টিকা দিয়ে যে এই পৃথিবীর লক্ষ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত হয়েছে, সেই পোলিওর টিকা হয়ত মানুষের নাগালে আসতে দশক পেরিয়ে যেত হেলা কোষ না থাকলে। অন্তত ১১ হাজার বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবণ রয়েছে যা হেলা কোষের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন পর্যন্ত এই কোষ উৎপাদন করা হয়েছে কমপক্ষে ২০ টন।

আজকে যদি মানুষের কোষের সঙ্গে সম্পর্কিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোন গবেষণা করার প্রসঙ্গ ওঠে, তাহলে সেইখানে হেলাকোষের নামটিও উচ্চারিত হয়। এখনো পৃথিবীর হাজারো গবেষণাগারে হেলা কোষের উপর গবেষণা হয়। চিকিৎসাকিজ্ঞানের গবেষণায় হেলা কোষের প্রয়োজন সম্ভবত কখনো ফুরোবে না। মানুষের কোষ নিয়ে পরীক্ষা করেছেন এমন একজনও শিক্ষার্থী-গবেষক পাওযা যাবেনা যে হেলা কোষ চেনেনা। বেশিরভাগেই হেলাকোষ নিয়ে কাজ করেছেন। হয়তো তাদের শিক্ষার প্রাথমিক হাতেখড়ি হয়েছে হেলা কোষের হাত ধরেই।

×××

হেনরিয়েটা ল্যাকসের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তিনি মাত্র নয়মাস বেঁচেছিলেন। তাঁর কোষ নিয়ে গবেষণার কথা তিনি জানতেন না। মৃত্যুর পর তাঁকে তার অজানা অবদানের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। তাঁর কোষ থেকে মানুষ যা পেয়েছে সে ফেরত দেয়া সম্ভব নয়। লক্ষ জীবন বেঁচেছে তাঁর কোষের অবদানে। আরো বাঁচবে। এই মুহূর্তে যদি হেনরিয়েটা ল্যাকস কথা বলতে পারতেন, তাহলে লক্ষ মানুষের জীবনের উপর, হাজার হাজার গবেষণার উপর, মানুষের অপরিসীম জ্ঞানের উপর তাঁর অধিকারের কথা বলতে পারতেন।

তথ্য:

Rebecca Skloot, The Immortal Life of Henrietta Lacks

কোন মন্তব্য নেই: