শুক্রবার, ৯ মে, ২০১৪

ভালোবাসার গল্প ২

৫ বছর আগে লেখা জ্যোতির এই ব্লগটার মতো দুঃখজাগানিয়া ব্লগ আমি কমই পড়েছি। একটা কারণ হচ্ছে, আমি পড়ি কম। সব সচলের চাইতে আমি কম পড়েছি। আরেকটা কারণ হচ্ছে, আমি দুঃখজাগানিয়া লেখা পড়িনা, বিরক্ত হই। জ্যোতি প্যানপ্যান করে এই লেখা লেখেনি। জ্যোতিকে চিনি বলে লেখাটা পড়া হয়েছিল।

জার্মানিতে আসার মাসদুয়েক পর ইন্দোনেশিয়ান এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার মেয়েরা অসামান্যা। বেশিরভাগেই আকারে বাঙালির কাছাকাছি। আর ওইটুকু শরীরে সব নারীত্ব এঁটেসেঁটে বসিয়ে দিতে প্রকৃতিকে বিশেষ যত্ন নিতে হয় বলে আমার বিশ্বাস। সেই মেয়ে যতদূর মনে পড়ে বন্ধুত্বের অমরত্ব ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ করার চেষ্টা করছিল। আমি তাকে বললাম, তোমার সঙ্গে কিছুদিন পর আমার আর কখনোই দেখা হবেনা! স্থায়ী ঘর বানিয়ে আমার প্রতিবেশি হয়ে যাবে সেরকম ভাবনা মেয়েটার নিশ্চয়ই ছিলনা। কিন্তু মেয়েটা প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করল তবুও।

আমি বললাম, ভেবে দেখ, পরের সেমেস্টার থেকেই আমরা আলাদা বিষয় নিয়ে আলাদা ক্লাসে বসব। তোমার পছন্দ পরিবেশ আর আমি যাচ্ছি সংক্রমণে। সেইজন্য একই ক্লাসে দেখা হওয়ার সম্ভাবণা নেই। তার ছ'মাস পরে লম্বা থিসিসের সময় দিনভর তুমি তোমার ল্যাবে আর আমি আমার। ততদিন মাঝেমধ্যে দেখা হয়েও যেতে পারে। বিশেষত তোমার রান্না ইন্দোনেশিয়ান খাবার যদি তুমি আরো কয়েকবার আমাকে খেতে ডাকো। কিন্তু সেই খাওয়াদাওয়ার পর তো আর দেখা হওয়ার সম্ভাবণা নেই। মেয়েটা মানতে চাইছিল না। কিন্তু ঠিকমতো প্রতিবাদও করে উঠতে পারছিল না। আমি তার খানিকটা বিমর্ষ মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, এখন অন্তত তুমি হাসতে পারো। মেয়েটা হেসে ফেলল। আহা! সেই হাসি আমার প্রথম প্রেমিকার হাসির সঙ্গে মিলে যায়। যেসব মেয়েরা ওইরকম করে হাসে, তাদেরকে দ্রুত বিদায় জানানোই ভালো!

রেইনার সঙ্গে আমার গত দুবছরে দেখা হয়নি। আর কখনো দেখা হয়ে উঠবেও না। দেশ ছাড়ার কিছুদিন আগে থেকেই হিসেব নিকেশে আমি পাকা হয়ে উঠেছি।

আমাদের ছোট শহরে আমরা তখন তিনজন বাঙালি থাকি। দেশ থেকে একটা ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন এক বড় ভাই। আরেকজন বাঙালি। তখন একজন বাঙালি মানে আমাদের কাছে উৎসবের উপলক্ষ। ওনাকে নিয়ে ওই দুদিনেই খানিক ঘুরলাম। সেই দুদিন পরে যখন উনি চলে যাচ্ছেন তখনো বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। আমি জানি আর কখনো দেখা হবেনা। হওয়ার নয়। আর কেবল দুদিনের পরিচয়ে একটা মানুষের জন্য মনখারাপ করার মতো ছেলেমানুষি হয়না! কিন্তু নাছোড়বান্দা দুঃখেরা হিসেব নিকেশের মারপ্যাচে আটকা পড়তে চায়না। উঁকি মেরে, অনিয়ম করে, দেয়াল টপকে দখল করতে চায়!

জ্যোতির ওই লেখাটার মতো দুঃখজাগানিয়ে লেখা আমি বোধহয় আর পড়িনি। সম্পর্কের টাইমবোমার টিকটিক আমার চারপাশে প্রতিমুহূর্তে বাজতে থাকে। আমি খুব চিন্তা না করেই, ওই টাইমবোমা বিস্ফোরণের সময় হিসেব করে ফেলি। ঠিক কতটা মিনিট আর এই মানুষটির সঙ্গে থাকা হবে, সেই হিসেব করে ফেলি আমি মুহূর্তে!

আমি দেশ ছাড়ার খানিক পরে দেশ ছেড়েছে জ্যোতি। কতবার একসঙ্গে দেশে যাওয়া হয়ে উঠবে? প্রতিবছরে একবার? অসম্ভব। ৫ বছরে একবার? হয়তো! কতবছর বাঁচবো আর? ৫০ বছর (অসম্ভব, আমি জানি)! তারমানে মরে যাওয়ার আগে মাত্র দশবার দেখা হবে জ্যোতির সঙ্গে? সেই সময়ের কতক্ষণ শাহবাগের মোড়ে চায়ের কাপ হাতে বসে থাকা হবে?

দেশ ছেড়ে আসার খানিক আগে এক ভদ্রবালিকা জিজ্ঞেস করেছিল, আমি ঢাকা আসলে তোমার সঙ্গে কি দেখা হবে? আমি বলেছি, না। হবেনা। সে কী কঠিন হিসেব। কঠিন হিসেব দেখিয়ে নিজেকে ঠাণ্ডা করে বসিয়ে রাখাই ভালো। শিখে গেছি ততদিনে। হিসেব করে দেখেছি, আর দেখা হবেনা। কখনোই না। যদি বেঁচে থাকি তবে তখনো একটা লম্বা জীবন। কত রাস্তা, কত মাস, বছর, কত ভ্রমন হবে। কত কত শহর বন্দর, কত মানুষ দেখা হয়ে উঠবে হয়তো। কত গান শোনা হবে, কত বই পড়া হবে, কত সিনেমা দেখা হবে। কত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কতোবার হেসে উঠবো। কতবার ছুঁয়ে দেব, কতবার বুকে বুক মিলিয়ে বিদায় নেবো। কতবার আবার দেখা হয়ে যাবে কত মানুষের সঙ্গে। কিন্তু ঠিক ওই মানুষটির সঙ্গে আর কখনো দেখা হবেনা। ঠিক ওইরকম ফার্মেসি পারফিউমের গন্ধ নিউরণের ঠিকঠিক ওইখানে বিদ্যুতের প্রবাহ হয়ে দৌঁড়ে বেড়াবে না। ঠিক ওইরকম একবারও পেছনে না তাকিয়ে ওই মানুষটি বিদায় নিয়ে চলে যাবেনা মিরপুর সাড়ে এগারোর ফলের দোকানগুলোর সামনে থেকে!

বছর পেরিয়ে গেল মা'র সঙ্গে দেখা হয়না। কতদিন বেঁচে থাকবো আর আমি? মা কতদিন বাঁচবেন? কতবার যাওয়া হবে দেশে ততদিনে? কতদিন থাকবো মায়ের কাছে? প্রতিদিন কতঘন্টা করে মায়ের পাশে বসে থাকা হবে? এই জীবনে যদি সব হিসেব একশোভাগ মিলে যায়, যদি কোন বিপর্যয় না হয়, যদি কোন ব্যতিক্রম না হয়, তাহলে মায়ের পাশে বসে থাকা হবে ঠিক কতটা ঘন্টা?

কী অদ্ভুত যে মানুষের জীবন!




কোন মন্তব্য নেই: